সংঘাত ও তেলের দামে শিশুর জীবনরক্ষাকারী সহায়তা সংকট

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সংঘাত ও তেলের দামে শিশুর জীবনরক্ষাকারী সহায়তা সংকট ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যে ছয় মাসের সংঘাতের পর তেলের দামে অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে প্রায় ১৫ লাখ শিশুর জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ঝুঁকিতে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়।

২০২৬ সালে যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার হওয়ার পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু এপ্রিলের শেষে দাম বেড়ে ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। রয়টার্সের মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেল প্রায় ৯০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর পণ্য, সরবরাহ ও পরিবহন খাতে তেলের বাড়তি দামের প্রভাব তারা হিসাব করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এই অর্থ দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশুকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব ছিল।

সেভ দ্য চিলড্রেনের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইলেম জুইডেমা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু ওই অঞ্চলের শিশুদের ঝুঁকিতে ফেলছে না, বিশ্বজুড়েও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানির দাম যতবার বাড়ছে, ততবারই বিশ্বজুড়ে ত্রাণবাহী ট্রাক, জাহাজ ও সরবরাহের প্রতিটি চালান পৌঁছে দেওয়ার খরচ বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কম শিশুর কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।’

সংকুচিত হচ্ছে তহবিল

জ্বালানির বাড়তি খরচ এমনিতেই চাপে থাকা মানবিক সহায়তা বাজেটকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির শিকার শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য, ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি এবং অন্যান্য জরুরি সেবায় ব্যয়ের অর্থ কমে যাচ্ছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের হিসাবে, বাড়তি ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিয়ে সোমালিয়ায় এক বছরের জন্য ৩০ শয্যার পাঁচটি হাসপাতাল পরিচালনা করা যেত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছয় মাসের জন্য পাঁচটি কলেরা চিকিৎসাকেন্দ্র চালানো অথবা লেবাননে বাস্তুচ্যুত ১ হাজার ৫০০ পরিবারের ছয় মাসের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল।

এই অর্থ দিয়ে সিরিয়ায় শিশুদের জন্য পাঁচটি নিরাপদ ও উপযোগী স্থান চালু রাখা, বিশ্বজুড়ে জটিল প্রসবের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ৩০টি অস্ত্রোপচারকক্ষের সরঞ্জাম সরবরাহ, সুদানে ৫০টি স্কুল পুনর্গঠন কিংবা আফগানিস্তানে ৪৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছয় মাস চালু রাখাও সম্ভব ছিল।

তেলের দামের ধাক্কা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও অপুষ্টির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধসহ সংঘাতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

‘ব্যবস্থায় আর কোনো সুরক্ষা নেই’

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সাধারণত মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের সম্ভাব্য দামের পূর্বাভাস ধরে বার্ষিক বাজেট তৈরি করে। সেভ দ্য চিলড্রেনের ২০২৬ সালের পণ্য সংগ্রহের বাজেটও সংঘাত শুরুর আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ তাদের সীমিত।

জুইডেমা বলেন, তেলের দাম বাড়ার কারণে অতিরিক্ত যে এক ডলার ব্যয় হচ্ছে, তা জীবনরক্ষাকারী সহায়তার প্রয়োজন থাকা শিশুদের জন্য এক ডলার কমিয়ে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, এরই মধ্যে সহায়তা কমে মানবিক বাজেটগুলো একেবারে ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। ‘ব্যবস্থায় আর কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই।’

ইরান সংঘাতের স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মানবিক সহায়তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন জুইডেমা। তাঁর মতে, শিশুরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক, তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেন সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

সরকারগুলো যখন বৈদেশিক সহায়তার বাজেট কমাচ্ছে এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার খরচ বাড়ছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছে সেভ দ্য চিলড্রেন।