কালান্দিয়া কেন্দ্রে ইসরায়েলি হানায় ক্ষুব্ধ জাতিসংঘ
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রবেশকে ‘বেআইনি’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। কেন্দ্রটি দ্রুত খালি করে জাতিসংঘের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবারের এই অভিযান ছিল মে মাসের পর কেন্দ্রটিতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পঞ্চম অননুমোদিত প্রবেশ। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেন, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী জাতিসংঘের কর্মীরা উপস্থিত থাকা অবস্থায় কেন্দ্রে ঢুকে সেখানে অবস্থান করে এবং অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন কাজ চালায়।
দুজারিক জানান, সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তরুণ ফিলিস্তিনিদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে আসা এই কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
অভিযানে ভারী নিরাপত্তা মোতায়েন
মঙ্গলবারের অভিযানের আগে কাছের কালান্দিয়া চেকপয়েন্ট বন্ধ করে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও পাশের শরণার্থী শিবিরে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে অন্তত চারটি সাঁজোয়া যান ও ৫০ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে বাহিনীটি কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। অভিযানে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও অংশ নেন। কেন্দ্রের আঙিনায় ইসরায়েলের পতাকা তোলা হয়।
ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, অভিযানের সময় কেন্দ্রটিতে তাদের প্রায় ২০ জন কর্মী ছিলেন। পরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রটি জব্দ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যেসব কর্মী ‘সন্ত্রাসবাদ ও ৭ অক্টোবরের হত্যাযজ্ঞে’ জড়িত ছিলেন, এমন কোনো সংস্থাকে ইসরায়েল তার ভূখণ্ডে কাজ করতে দেবে না। ২০২৪ সালে পাস হওয়া একটি আইনের আওতায় কেন্দ্রটি থেকে ইউএনআরডব্লিউএকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও তিনি দিয়েছেন।
জমির মালিকানা নিয়ে ইসরায়েলের দাবি
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, কেন্দ্রটি যে জমির ওপর নির্মিত, সেটির মালিকানা ১৯৩৭ সাল থেকে ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ডের। জমিটি জেরুজালেম পৌরসভার ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কোনো মালিকানা অধিকার ছাড়াই ইউএনআরডব্লিউএ কয়েক দশক ধরে জমিটি ঘিরে রেখেছে।
তবে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে ইউএনআরডব্লিউএ। সংস্থাটি বলেছে, ১৯৫২ সালে জর্ডান সরকার একটি চুক্তির আওতায় জমিটি তাদের ব্যবহার করতে দিয়েছিল এবং সেই চুক্তি এখনো কার্যকর।
ইউএনআরডব্লিউএ আরও বলেছে, কেন্দ্রটি জাতিসংঘের একটি স্থাপনা। ফলে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এটি সুরক্ষিত এবং সেখানে হস্তক্ষেপ করা যায় না।
আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করালেন গুতেরেস
দুজারিক বলেন, কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ ইউএনআরডব্লিউএর অন্যান্য স্থাপনা জাতিসংঘের সম্পত্তি। এসব স্থাপনা ‘অলঙ্ঘনীয়’ এবং যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে দায়মুক্ত।
তার মতে, মঙ্গলবারের ইসরায়েলি পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদ এবং জাতিসংঘের সুযোগ-সুবিধা ও দায়মুক্তি সম্পর্কিত কনভেনশনের অধীনে ইসরায়েলের দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবরের পরামর্শমূলক মতামতের কথাও উল্লেখ করেন। ওই মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের স্থাপনাগুলোর অলঙ্ঘনীয়তা সম্মান করা এবং তাদের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে ইসরায়েলের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গুতেরেস ইসরায়েলকে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা অভ্যন্তরীণ আইন বাতিলের আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ওই আইন সংস্থাটিকে সাধারণ পরিষদের দেওয়া দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের বাধার মুখে ফেলছে।
কেন্দ্র ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি
জাতিসংঘ মহাসচিব ইসরায়েলি সরকারকে ইউএনআরডব্লিউএর স্থাপনাগুলোতে হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দখল করা ও ক্ষতিগ্রস্ত সব স্থাপনা দ্রুত খালি করে জাতিসংঘের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা যেন ক্ষতি বা হস্তক্ষেপের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলেছেন।
কালান্দিয়া কেন্দ্রে সর্বশেষ অভিযানটি ঘটে সেখানে ২৫টির বেশি কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সফরের একদিন পর। যুদ্ধ শুরুর পর কেন্দ্রটিতে এ ধরনের একাধিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অভিযানে কেন্দ্রটিতে থাকা ৩৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীর ওপর কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সে সময় জানিয়েছিল ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার-জেনারেল।
কালান্দিয়া কেন্দ্রটিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে প্রতিবছর শত শত ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী কারিগরি প্রশিক্ষণ নেয়। ইসরায়েলি বাহিনী মঙ্গলবার সেখানে প্রবেশের সময় নতুন শিক্ষাবর্ষের নিবন্ধন চলছিল। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা।