তাইওয়ান মন্তব্যে আনোয়ারের জোটনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে প্রশ্ন

 প্রকাশ: ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

তাইওয়ান মন্তব্যে আনোয়ারের জোটনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে প্রশ্ন ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের তাইওয়ান নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে দেশটির দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পক্ষ না নেওয়ার নীতি থেকে কুয়ালালামপুর সরে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার বলেন, তিনি তাইওয়ানকে ‘চীনের অংশ, ব্যস’ হিসেবে দেখেন। তাঁর দাবি, এই অবস্থান ‘সবাই মেনে নিয়েছে’।

তবে শান্তিপূর্ণভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনরেকত্রীকরণ’ সম্ভব না হলে চীন শক্তি প্রয়োগ করলে তিনি বেইজিংয়ের সমালোচনা করবেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারের বক্তব্যই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার কোনো অঙ্গরাজ্য বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করলে দেশের ‘অখণ্ডতা ও ঐক্য রক্ষায়’ তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন।

আনোয়ারের মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তাইওয়ান ‘চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এবং চীনকে অবশ্যই পুনরেকত্রীকরণ করতে হবে।

তবে তাইওয়ান আনোয়ারের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। তাইওয়ানের সরকার সতর্ক করে বলেছে, চীনের প্রতি মালয়েশিয়ার এমন ‘একতরফা সমর্থন’ দেশটিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের ব্যবসায়ীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাইওয়ান বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ উৎপাদক এবং মালয়েশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে দেশটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে।

অবস্থান কিছুটা নরম করলেন আনোয়ার

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখে পরে আনোয়ার তাঁর বক্তব্যের কিছুটা ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের অবস্থানকে মালয়েশিয়া সম্মান করে। একই সঙ্গে তাইওয়ান প্রণালির উত্তেজনা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষেও দেশটির অবস্থান স্পষ্ট করেন।

এর কয়েক দিন পর আবারও আলোচনায় আসেন আনোয়ার। তিনি মালয়েশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের সাবাহ রাজ্যের প্রতিরক্ষা জোরদারের আহ্বান জানান।

প্রতিবেশী ফিলিপাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সামরিক স্থাপনা উন্নয়নের বিষয়টি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

ফিলিপাইন বর্তমানে সাবাহর কাছাকাছি বালাবাক দ্বীপে সামরিক স্থাপনা আধুনিকায়ন করছে। মালয়েশিয়ার বাংগি ও বালামবাঙ্গান দ্বীপ থেকে বালাবাকের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

বালাবাককে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের এনহ্যান্সড ডিফেন্স কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে ফিলিপাইনের নির্ধারিত কিছু স্থাপনায় মার্কিন বাহিনীর প্রবেশাধিকার রয়েছে।

চীনের দিকে ঝুঁকছে মালয়েশিয়া?

আনোয়ারের বক্তব্য পশ্চিমা বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, মালয়েশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং দেশটির প্রচলিত জোটনিরপেক্ষ নীতি বদলাচ্ছে।

চীন এখন মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পেরও অন্যতম সক্রিয় গ্রহণকারী মালয়েশিয়া।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান থেকে মালয়েশিয়া অনেক সময় আলাদা পথে হাঁটছে। ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত দেশটি আনোয়ারের নেতৃত্বে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরুদ্ধেও জোরালো অবস্থান নিয়েছে।

তবে কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করেন, এসব পদক্ষেপকে মালয়েশিয়ার কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

নটিংহাম মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক চি মেং তান বলেন, তাইওয়ানকে ‘চীনের অংশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার নীতি মালয়েশিয়ার জন্য নতুন নয়। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তুন আবদুল রাজাক ও চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় যে যৌথ ঘোষণায় সই করেছিলেন, সেই নীতির ভিত্তি সেখানেই।

তাঁর মতে, নতুন বিষয় হলো তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আনোয়ারের মন্তব্য। কারণ ‘এক চীন’ নীতিতে এমন শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা নেই।

তান আরও মনে করেন, সেপ্টেম্বরে আনোয়ারের সম্ভাব্য চীন সফরের প্রেক্ষাপটেও তাঁর বক্তব্যকে দেখা দরকার। সফরের আগে বেইজিংকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা এর পেছনে থাকতে পারে।

সাবাহ ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বালাবাকের সামরিক স্থাপনা নিয়ে আনোয়ারের উদ্বেগকে চীনের প্রতি সমর্থনের সরাসরি ইঙ্গিত না-ও ধরা যেতে পারে। এর সঙ্গে মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের দীর্ঘদিনের সাবাহ বিরোধও জড়িত।

১৯৬৩ সালে সাবাহ মালয়েশিয়ার অংশ হওয়ার পর থেকেই ফিলিপাইন ওই ভূখণ্ডের দাবি করে আসছে। মালয়েশিয়া বরাবরই সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ম্যানিলা আবারও সাবাহর দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। ফিলিপাইন বলেছে, ২০২৪ সালের মেরিটাইম জোনস অ্যাক্টের মাধ্যমে সাবাহর অংশ নিয়ে তাদের ‘বিদ্যমান ও বৈধ দাবি’ বহাল রয়েছে।

জুলাইয়ে মালয়েশিয়া ফিলিপাইনের বর্ধিত মহীসোপান দাবির বিরুদ্ধে জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। কুয়ালালামপুরের দাবি, ওই দাবি সাবাহর জলসীমায় হস্তক্ষেপ করছে।

সহকারী অধ্যাপক চি মেং তানের মতে, বালাবাকে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে আনোয়ারের বক্তব্যকে ‘নিজের সীমান্ত রক্ষার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এটিকে চীনের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

সাবাহর প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার উদ্যোগের আরেকটি কারণ দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার দাবি। বিরোধপূর্ণ এই জলসীমায় চীনের পাশাপাশি মালয়েশিয়াও দাবিদার।

ফিলিপাইনের তুলনায় দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে মালয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে কম সরব। কিন্তু বিরোধপূর্ণ জলসীমায় চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে কুয়ালালামপুর।

পশ্চিমের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অটুট

এর বড় উদাহরণ হলো ফাইভ পাওয়ার ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্টস বা এফপিডিএতে মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা। এই বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় মালয়েশিয়ার সঙ্গে রয়েছে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য।

এটি বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। তবে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে সশস্ত্র হামলা হলে সদস্য দেশগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এই কাঠামোর অধীনে প্রতি বছর ‘বেরসামা শিল্ড’ ও ‘বেরসামা লিমা’ নামে দুটি বড় সামরিক মহড়া হয়। এতে সদস্য দেশগুলোর সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম অংশ নেয়।

এফপিডিএর বিমান প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের সদর দপ্তর মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের বাটারওয়ার্থে একটি বিমানঘাঁটিতে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বিমানবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

বাটারওয়ার্থে অস্ট্রেলিয়ার একটি রাইফেল কোম্পানিও রয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক টহল বিমান মোতায়েনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ওই অঞ্চলে নিয়মিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চালায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এফপিডিএর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে মালয়েশিয়া এই পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে, যা সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ তৈরি করে।

ভারসাম্যই কি মালয়েশিয়ার কৌশল?

পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি পশ্চিমা বিনিয়োগও মালয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলেও কোনো একক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রয়োজন কুয়ালালামপুরের নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চীনা বিনিয়োগবিষয়ক গবেষক ড্যানিয়েল লোয়েবেল মনে করেন, মালয়েশিয়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে। এ কারণেই দেশটি কোনো বড় শক্তির সঙ্গে গভীরভাবে জোটবদ্ধ হয়নি।

তাঁর মতে, অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও চীনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

লোয়েবেল মনে করেন, মালয়েশিয়া চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জোট বাঁধতে চাইছে-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। কারণ তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে, যা আনোয়ারের সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তাইওয়ান নিয়ে আনোয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বেইজিং খুশি হলেও, মালয়েশিয়ার বৃহত্তর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এখনো চীন ও পশ্চিম-দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলার কৌশলই বেশি স্পষ্ট।

সূত্র: আলজাজিরা