তিউনিসিয়ায় অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি, ১২ জনের মৃত্যু; বিক্ষোভে উত্তাল বেন গেরদানে
তিউনিসিয়ায় নৌকাডুবিতে ১২ মৃত্যু, বিক্ষোভে উত্তাল বেন গেরদানে
তিউনিসিয়ায় নৌকাডুবি ও অভিবাসন সংকটআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করা অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে তিউনিসিয়ায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। মর্মান্তিক এই নৌকাডুবির পর দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেন গেরদানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
নৌকাটিতে মোট ১৫ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজ দুজনের সন্ধানে মঙ্গলবারও সাগরে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা।
আলজাজিরার যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সোমবার জারজিস শহরের স্বেচ্ছাসেবকেরা মাছ ধরার নৌকায় করে সাগরে নেমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করছেন।
জারজিস উপকূলের কাছে ডুবে যায় নৌকা
নৌকাটি গত শুক্রবার রাতে জারজিস ও বেন গেরদানের মধ্যবর্তী একটি এলাকা থেকে ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জারজিস উপকূল থেকে প্রায় ১৪ নটিক্যাল মাইল বা ২৬ কিলোমিটার দূরে নৌকাটি ডুবে যায়।
নৌকার যাত্রীদের বেশির ভাগই ছিলেন তরুণ। তিউনিসিয়ার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সাগরে ভেসে থাকার পর একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাঁকে উদ্ধার করে।
তিউনিসিয়ার ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নৌকার ১৫ যাত্রীর মধ্যে ১৪ জনই বেন গেরদানের বাসিন্দা ছিলেন। অন্য একজনের বাড়ি জারজিসে।
জীবনযাত্রার সংকটে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা
নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার রাতে বেন গেরদানে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, উন্নত জীবনযাপন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে তরুণেরা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
তাঁদের দাবি, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই পরিবারের সাতজন ছিলেন নৌকায়
তিউনিসিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের প্রধান মোস্তফা আবদেলকেবির জানিয়েছেন, নৌকাটির যাত্রীদের মধ্যে একই পরিবারের সাতজন ছিলেন।
তিনি রয়টার্সকে জানান, গত দুই দিনে সাগর থেকে উদ্ধার করা অন্তত ১৯টি মরদেহ বেন গেরদানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহ একই নৌকার যাত্রীদের কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মরদেহ শনাক্ত করতে জেনেটিক পরীক্ষা চলছে। এর মাধ্যমে নৌকাটিতে প্রকৃতপক্ষে কতজন যাত্রী ছিলেন, সেটিও নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার দাবি
নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় তিউনিসিয়ায় জাতীয় শোক দিবস ঘোষণার দাবিও উঠেছে। আইনপ্রণেতা ইমাদ উলাদ জিবরিল ঘটনাটিকে এমন একটি দেশের ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তরুণেরা কঠিন বাস্তবতা থেকে পালাতে গিয়ে সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন।
বিরোধী ডেমোক্রেটিক ব্লক পার্টিও নৌকাডুবির ঘটনাকে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দলটির প্রশ্ন, ‘তিউনিসিয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে সাগর পাড়ি দেওয়া যদি সহজ হয়ে যায়, তাহলে দায় কার?’
তিউনিসিয়ার উপকূলে আগেও প্রাণহানি
তিউনিসিয়ার উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। ২০১৮ সালের কেরকেন্নাহ দুর্ঘটনায় একটি অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন। ওই ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
২০২২ সালে জারজিসে আরেকটি অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে বিক্ষোভ চলে।
তিউনিসিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপ থেকে মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার দূরে। এ কারণে ইউরোপে পৌঁছাতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের কাছে এই উপকূল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের প্রাণঘাতী অভিবাসন রুটগুলোর একটি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাবে, মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট। চলতি বছর এই পথে অন্তত ৮২১ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।
পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে চলতি বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৬৫ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইওএম।
তিউনিসিয়ার সর্বশেষ এই নৌকাডুবি আবারও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকি এবং অভিবাসন সংকটের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: আলজাজিরা