শিল্পকারখানায় বাড়ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ৬০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে উৎপাদনক্ষমতা
ছবি-সংগৃহীতঢাকা, ২৬ আগস্ট ২০২৬:
দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রত্যাশা পূরণে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর বড় অংশই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে। গত দুই বছরেই এ ধরনের বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের গতি সবচেয়ে বেশি ছিল।
শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপ তাদের সাতটি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে মোট ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি সিরামিক ও তৈরি পোশাকসহ আরও ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৮ মেগাওয়াট উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। অবশিষ্ট সক্ষমতা আগামী বছর চালু হবে।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রত্যাশা পূরণে প্রতিষ্ঠানটি সৌরবিদ্যুতে দ্রুত বিনিয়োগ করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আগের তুলনায় কম সময়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। শিল্পকারখানার ছাদে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে ব্যয় পড়ছে আনুমানিক ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।
শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সাধারণত কারখানার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করে না। তবে দিনের ব্যস্ত সময়ে কয়েক ঘণ্টা কারখানার কার্যক্রম সচল রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ থেকে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় এ হার আরও বেশি। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কিছুটা কমছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদেই সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা প্রায় ৬৬৭ মেগাওয়াট। ছোট ও মাঝারি স্থাপনা হিসাবের আওতায় এলে দেশের মোট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
আইইইএফএর বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন জাতীয় বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমাতে ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১১ জুন এবং ২০২৬ সালের একই সময়ের বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনামূলক বিশ্লেষণেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল তাদের বিভিন্ন কারখানায় ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। ইতোমধ্যে ২০টি কারখানায় প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চলতি বছরের মধ্যে আরও অন্তত ৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দুটি কারখানা থেকে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
আকিজ বশির গ্রুপও শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জনতা জুট মিলে ২১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে পাটকলটির বিদ্যুৎ চাহিদার পুরোটা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানায় ১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রাতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে কারখানাটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কারখানা মিলিয়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট। আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার কাজ চলছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) তাদের বিভিন্ন কারখানার ছাদে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। এ বিদ্যুৎ তাদের কারখানাগুলোর মোট চাহিদার প্রায় ৫ শতাংশ পূরণ করছে। ভবিষ্যতে আরও ৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।
এমজিআইয়ের পরিচালক তানভীর মোস্তফা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। কারখানার ছাদের পাশাপাশি ভবনের সম্মুখভাগ, সীমানাপ্রাচীর এবং সড়ক বিভাজকের আলোকব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে দেশের প্রায় ১০০টি শিল্পকারখানার ছাদে ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। বর্তমানে আরও ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ চলছে। এসব প্রকল্প চালু হলে অতিরিক্ত প্রায় ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান জানান, গত দুই বছরে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের গড় কার্যকর জীবনকাল প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর। প্রাথমিক বিনিয়োগের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে গ্রিড থেকে কেনা বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অনেক কম হওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
তৈরি পোশাক খাতের রাইজিং গ্রুপ তাদের ছয়টি শিল্পকারখানার ছাদে ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির দুটি পোশাক কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে। অন্য দুটি স্পিনিং মিলের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ১৫ শতাংশ।
রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান জানান, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সালে মানিকগঞ্জের একটি স্পিনিং মিলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্যান্য কারখানায় ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক ও ব্যয় সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা হয়। গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় অর্ধেক হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগকে কার্যকর মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান—আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ, টিম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ঊর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, কর্ণফুলী শু ইন্ডাস্ট্রিজ ও মাসকো গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে।
জ্বালানি ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিল্পখাতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের অবদান আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।