কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি শুল্কে বাড়বে মূল্যস্ফীতি

 প্রকাশ: ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি শুল্কে বাড়বে মূল্যস্ফীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়েছে। ওয়াশিংটনের নতুন শুল্কের জবাবে মার্কিন পণ্যে ‘ডলার-ফর-ডলার’ হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই পাল্টাপাল্টি শুল্কে দুই দেশের ব্যবসার খরচ ও ভোক্তাপর্যায়ের দাম বাড়বে।

কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর শনিবার কার্নি এই ঘোষণা দেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এই পণ্যগুলো কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গত বছর কানাডার গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে প্রথম দফা শুল্ক আরোপ করেন। এরপর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক দফা টানাপোড়েন হয়েছে। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।

যে কারণে আলোচনা ভেঙে গেল

অটোয়ায় শনিবার কার্নি বলেন, আগের দিন রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যায়। তাঁর ভাষ্য, ওয়াশিংটন এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা কানাডার জন্য অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর, অন্যায্য এবং কোনো চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সুফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার সক্ষমতা সীমিত করতে চেয়েছিল, যা কানাডার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি ফরাসি ভাষা ও কুইবেকের সংস্কৃতি নিয়ে মার্কিন আলোচকদের কিছু ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কার্নির ভাষায়, শেষ মুহূর্তে আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যাওয়ায় কানাডা ওয়াশিংটন থেকে নিজেদের আলোচকদের ফিরিয়ে নেয়। তিনি বলেন, ‘তারা অনেক বেশি চেয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে দিয়েছে খুব কম।’

জবাবে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কানাডাকে কটাক্ষ করে বলেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য না হয়েও একটি অঙ্গরাজ্য হওয়ার সুবিধা নিতে চায়। এর আগে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকিও দিয়েছেন।

কানাডার কোন পণ্যে শুল্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কানাডার ৫০০টির বেশি পণ্যশ্রেণিতে কার্যকর হবে। এর মধ্যে রয়েছে মদ ও বিয়ার, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, স্মার্টফোন, ক্যামেরা, রাডার ও অ্যান্টেনার মতো প্রযুক্তিপণ্য।

হকি সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রীও শুল্কের আওতায় পড়বে। এর সঙ্গে কাঠ, করাতকাঠ, প্লাইউড, আসবাব ও বেড়ার উপকরণ, খেলনা, পোশাক, বড়দিনের সাজসজ্জা, গয়না, প্রসাধনী ও সুগন্ধিও রয়েছে।

কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আগের যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্যচুক্তির আওতায় পাওয়া সুবিধাও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর বাইরে ইস্পাত, কাঠ ও গাড়ির ওপর আগে থেকেই থাকা মার্কিন শুল্কও বহাল রয়েছে।

পাল্টা শুল্কে মার্কিন পণ্যও ছাড়ছে না

কানাডা আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ এবং ইলেকট্রনিক পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে।

কোন কোন পণ্যে ঠিক কত শুল্ক বসবে, তার বিস্তারিত তালিকা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন কার্নি।

চাপে পড়বে কানাডার অর্থনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শুল্ক কানাডার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। আলবার্টা প্রদেশের ক্যালগারি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্যের উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং বেকারত্ব—তিনটিই বাড়তে পারে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।

মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান কারাগেসিয়ান বলেন, শুল্কের কারণে শত শত কানাডীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা হারাতে পারে।

তবে সব মিলিয়ে কানাডার অর্থনীতিতে আঘাতের মাত্রা সীমিত থাকতে পারে বলেও মত রয়েছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ স্টিভেন ওকুনের হিসাবে, ৩৮২ বিলিয়ন ডলারের বাজারে কানাডার রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশ নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে। তাই পুরো অর্থনীতির জন্য এটি ‘বিশাল ধাক্কা’ নয়।

তারপরও কানাডার জন্য বড় সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর কানাডার মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৪০৯ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গেছে। যুক্তরাজ্যে গেছে ৬ শতাংশ এবং চীনে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

কার্নি অবশ্য এই সংকটকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে তাঁর সরকার।

ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রও

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্কের প্রভাব শুধু কানাডায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমদানি করা পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক বসলে ব্যবসার খরচ বাড়ে, আর সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রেও পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২০০ কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বিজনেস রাউন্ডটেবল সতর্ক করেছে, নতুন শুল্ক মার্কিন ব্যবসা ও পরিবারগুলোর খরচ বাড়াতে পারে। সংগঠনটি দুই দেশকে আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ওকুনের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বা বিনিয়োগ বাড়াতে পারেনি; বরং পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট খাত বা নির্দিষ্ট দেশের অন্যায্য বাণিজ্যনীতিকে লক্ষ্য করে শুল্ক আরোপ কার্যকর হতে পারে, কিন্তু ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপ ক্ষতিকর।

সাবেক কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বিশেষ উপদেষ্টা ডায়মন্ড ইজিঙ্গারের মতে, শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডীয় ও মার্কিন-দুই দেশের মানুষকেই মূল্য দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং কানাডার পাল্টা ব্যবস্থা উভয় দেশের জন্যই অর্থনৈতিক চাপ ও দুর্ভোগ তৈরি করবে।

সূত্র: আলজাজিরা