খুনের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছে উদ্বেগ, সামনে অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধী চক্রের তৎপরতা

 প্রকাশ: ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

খুনের পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছে উদ্বেগ, সামনে অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধী চক্রের তৎপরতা

সফি রহমান:

দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক ঘটনায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশে খুনের ঘটনায় ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ২৯৬টি হত্যার মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই মাসে ২৯৮টি হত্যার মামলা হয়েছে। এর আগের দুই মাসে মে ও জুনে যথাক্রমে ৩১০ ও ৩২৬টি মামলা হয়। সব মিলিয়ে মে থেকে জুলাইএই তিন মাসে হত্যার মামলা দাঁড়িয়েছে ৯৩৪টিতে।

চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি এবং এপ্রিলে ২৮৮টি হত্যার মামলা নথিভুক্ত হয়। এসব সংখ্যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একের পর এক হত্যাকাণ্ড

সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকায় একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের সদস্যদের হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বাগেরহাট, ফরিদপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, জামালপুর ও ঝিনাইদহে পৃথক ঘটনায় পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানীতেও হত্যাকাণ্ডের চিত্র উদ্বেগজনক। পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে ঢাকা মহানগরে ৩১টি হত্যার মামলা হয়েছে। জুনে এ সংখ্যা ছিল ২৩ এবং মে মাসে ১৬টি। অর্থাৎ তিন মাসে রাজধানীতে মোট ৭০টি হত্যার মামলা হয়েছে এবং ধারাবাহিকভাবে সংখ্যাটি বেড়েছে।

কোন এলাকায় বেশি হত্যা

জুলাইয়ের হিসাবে দেশের বিভিন্ন পুলিশ রেঞ্জের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে সর্বাধিক ৬৬টি হত্যার মামলা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি, খুলনায় ২৯টি, ময়মনসিংহে ২৭টি, রাজশাহীতে ২৪টি, রংপুরে ১৮টি, সিলেটে ১৫টি এবং বরিশালে ১৪টি মামলা হয়েছে।

মহানগরগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে ঢাকায় ৩১টি, গাজীপুরে ৭টি, সিলেটে ৫টি, চট্টগ্রামে ৪টি, খুলনায় ৩টি এবং রাজশাহীতে একটি হত্যার মামলা হয়েছে। বরিশাল ও রংপুর মহানগরে ওই মাসে হত্যার মামলা হয়নি।

মে, জুন ও জুলাইএই তিন মাসের হিসাবেও কয়েকটি এলাকায় হত্যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ সময়ে ঢাকা রেঞ্জে ২১২টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১৯২টি মামলা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জে তিন মাসে হত্যার মামলা হয়েছে ৮৫টি।

হত্যার পেছনে একাধিক কারণ

আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মাদককে কেন্দ্র করে বিরোধ, কিশোর গ্যাং, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের পর হত্যার মতো বিভিন্ন কারণ এতে ভূমিকা রাখছে।

কিছু এলাকায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাও সামনে এসেছে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

অবৈধ অস্ত্র নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশে ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৯ জন নিহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে ১০৯টি চীনা রাইফেল এবং ৩০টি এসএমজি রয়েছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গুলি এখনও উদ্ধার হয়নি।

অপরাধী চক্রগুলোর হাতে অবৈধ আধুনিক অস্ত্র থাকার বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিরোধও বড় কারণ

হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় প্রায় ৪০০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব অনেক সময় সরাসরি সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

আগের বছরগুলোর তুলনায় চিত্র

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের মামলা ছিল মোট ৭৮২টি। ওই সময়ে মাসিক গড় ছিল প্রায় ২৬০টি।

২০২৪ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে হত্যার মামলা হয়েছিল ৮৬১টি, মাসিক গড় প্রায় ২৮৭টি। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে মামলার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৬২৬টিতে পৌঁছায়। এর একটি অংশ ছিল আগের বছরের অপরাধের মামলা।

অন্যদিকে ২০২৩ সালে সারাদেশে হত্যার মামলা হয়েছিল মোট ৩ হাজার ২৩টি, যা মাসিক গড়ে প্রায় ২৫১টি।

পরিসংখ্যান তুলনা করলে সাম্প্রতিক সময়ে হত্যার মামলা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টি হত্যার মামলা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বিরোধ, ক্রোধ ও আকস্মিক পরিস্থিতি থেকে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেগুলো আগেভাগে প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব হয় না।

তিনি জানান, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এসব ঘটনায় ভাড়াটে খুনি, চরমপন্থি এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ও তদন্তে উঠে আসে।

তবে পুলিশের দাবি, সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে তারা সফল হয়েছে। অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হত্যাকাণ্ড কমানোর বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বদলি, সংযুক্তি, চাকরি হারানোর আশঙ্কা, মামলা এবং বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি দাবি করেছেন, গত ছয় মাস বা ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণ পরিস্থিতি নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট, সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্বসবকিছু মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, হত্যাকাণ্ড কমাতে শুধু ঘটনার পর আসামি গ্রেপ্তার নয়; অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।