খুলনায় থামছে না খুন: ‘২০-৩০ সন্ত্রাসীর কাছে জিম্মি’ নগরবাসী
খুলনা ব্যুরো :
খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ থাকলেও থামছে না হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৬৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন বলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর ডাকবাংলা মোড়, লবণচরা, রায়েরমহল, দৌলতপুর, জেলা জজ আদালতসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান ও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
গত মাসে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হুরে জান্নাত বলেন, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকরভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
সভায় জানানো হয়, মে ও জুন মাসে জেলায় ১১টি হত্যা, ১০টি ধর্ষণ, ছয়টি অপহরণ এবং অস্ত্র আইনে আটটি মামলা হয়েছে। ঈদের পর একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলও বিভিন্ন সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছেন বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
‘২০-৩০ সন্ত্রাসীর সন্ত্রাসীর কাছে জিম্মি’
সভায় কেএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন বলেন, অপরাধ দমনে নগরীতে নিয়মিত অভিযান চলছে। জুনে সংঘটিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। ১২ জুন মাথাভাঙ্গা এলাকায় রফিকুল ইসলাম গাজী হত্যার ঘটনায় জড়িতদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না বলে তিনি স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, নগরীর পরিস্থিতি ২০ থেকে ৩০ জন সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ডের কারণে জটিল হয়ে উঠেছে।
খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, জুনে জেলার দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে।
আধিপত্য ও মাদককে ঘিরে সংঘাত
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, খুলনায় অপরাধের ধরন সময়ের সঙ্গে বদলেছে। অতীতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও দুর্ধর্ষ অপরাধীদের তৎপরতা থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দখল, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডাকবাংলা মোড়ে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম গাজী ও রাশিকুল ইসলাম রাসু হত্যাকাণ্ডসহ কয়েকটি ঘটনায় নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অস্ত্র উদ্ধারে তৎপরতা
অপর একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কেএমপি ২৪টি, ২০২৫ সালে ৪৭টি এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নগরীতে ১৭টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। জেলা পর্যায়েও ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের খবরও এসেছে। তবে এসব অভিযানের পরও নতুন করে অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত অভিযান জোরদারের দাবি উঠেছে।
সুন্দরবনেও অভিযান
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শহিদ সভায় বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখা এবং জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ১৬ জুন থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ৩৪ জন ডাকাতকে গ্রেপ্তার ও ৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্য তিনি জানান। এ সময় দুটি ডাকাত দল আত্মসমর্পণ করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়। গত দুই বছরে ৮৮ জন ডাকাতকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সভায় তুলে ধরা হয়।
‘অপরাধ দমনে আশানুরূপ ফল নেই’
খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান ও নগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনি বলেন, জেলায় অপরাধ দমনে এখনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও তুলে ধরেন।
নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, নগরীতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়ছে। তাঁর দাবি, হাতে গোনা কয়েকজন সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ডে নগরবাসী জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়লেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। এখন অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।