কুল বা বরইয়ের পুষ্টিগুণ ও পরিচর্যা
ইংরেজি
নামঃ Jujube, Ber
Scientific
Name: Ziziphus mauritiana
কুল বা বরই বাংলাদেশের
একটি জনপ্রিয় ফল। এটি শীতকালীন ফল হলেও আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায়
সারা বছর উৎপাদন করা সম্ভব। পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে কুল চাষ অত্যন্ত
লাভজনক।
কুলের পুষ্টিগুণ
কুলের পুষ্টিগুণ অনেক।
নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।
- ভিটামিন সি:
কুলে
প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য
করে।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট:
কুল
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ, যা ফ্রি র্যাডিকেলগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং কোষের
ক্ষতি প্রতিরোধ করে।
- ফাইবার:
কুলে
থাকা ফাইবার হজমশক্তি উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে।
- মিনারেলস:
কুল
পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন এবং জিঙ্কের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ
করে।
- ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেট:
কুলে ক্যালরির পরিমাণ কম থাকে, তবে শর্করা এবং ফাইবার
সরবরাহ করে।
কুলের উপকারিতা:
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
- হজমশক্তি উন্নত করে।
- ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
- ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
- ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য
উপকারী।
কুল
একটি স্বাস্থ্যকর ফল যা নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যোগ করা যেতে পারে। এটি
বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়, যেমন - কাঁচা, আচার বা চাটনি হিসেবে।
জাত
পরিচিতিঃ
বাংলাদেশে
কুলের অনেক জাত রয়েছে, যার মধ্যে কিছু জনপ্রিয় জাত হলো: বারি কুল-১, বারি
কুল-২, বারি কুল-৩, বাউকুল-১, বাউকুল-২, আপেল কুল, এবং কাশ্মিরী কুল। এছাড়াও,
স্থানীয়ভাবে "নারিকেলী", "কুমিল্লা", "শাহ কুল"
ইত্যাদি নামেও বিভিন্ন জাতের কুল পরিচিত।
কিছু জনপ্রিয় কুলের
জাতের বিস্তারিত তথ্য:
- বারি কুল-১ (নারকেলি):
এটি
একটি জনপ্রিয় জাত, যা নারিকেলের মত স্বাদযুক্ত ও আকারে বড় হয়ে থাকে।
- বারি কুল-২, বারি কুল-৩ এবং বারি কুল-৪ :
এই
জাতগুলোও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল মিষ্টি
কুলের জাত।
- বারি কুল-৫:
এই জাতটি বারি উদ্ভাবিত টক
কুলের জাত।
- বাউকুল-১, বাউকুল-২,
বাউকুল-৩:
এই
জাতগুলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে। বাউকুল-১ আকারে বেশ বড়
হয় এবং এর স্বাদও ভালো।
- আপেল কুল:
এই
জাতটির নামকরণ করা হয়েছে আপেলের মতো দেখতে হওয়ার কারণে।
- কাশ্মিরী কুল:
এটি
একটি আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু জাত, যা দেখতে অনেকটা আপেলের মতো।
- বলসুন্দরী কুল:
এটি
একটি উন্নত জাত, যা দেখতে আকর্ষণীয় এবং সুস্বাদু।
জলবায়ু ও মাটি:
উষ্ণ ও শুষ্ক জলবায়ু কুল চাষের জন্য
সর্বোত্তম। এতে কুলের ফলন ও গুণগতমান দুই-ই ভাল হয়। তবে কুলের পরিবেশ উপযোগিতা
ব্যাপক বিধায় আর্দ্র ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় সফলভাবে এর চাষ করা সম্ভব। উঁচু
সুনিষ্কাশিত বেলে দোআঁশ অথবা দোআঁশ মাটি কুল চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে সব
ধরনের মাটিতেই কুলের চাষ করা যায়। অন্যান্য প্রধান ফল ও ফসলের জন্য উপযোগী নয় এ
ধরনের অনুর্বর জমিতে এমনকি উপক‚লীয় লবণাক্ত জমিতেও সন্তোষজনকভাবে কুলের চাষ করা
সম্ভব।
বংশ বিস্তার:
দু’ভাবে বংশ বিস্তার করা যায়, বীজ থেকে
এবং কলম তৈরি করে। কলমের চারা উত্তম কারণ এতে বংশগত গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে। বীজ
থেকে চারা পেতে হলে বীজকে ভিজা গরম বালির ভেতর দেড় থেকে দুই মাস রেখে
দিলে চারা তাড়াতাড়ি গজাবে, না হলে ৬-৮ সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। অন্যদিকে, কলমের চারা
পেতে হলে নির্বাচিত স্থানে বীজ বপন ও চারা তৈরি করে তার উপর ‘বাডিং’ এর
মাধ্যমে কলম করে নেয়াই শ্রেয়। বলয় (Ring), তালি (Patch) অথবা T-বাডিং যে কোন পদ্ধতিতেই
বাডিং করা যায়। তালি, চোখ কলম অপেক্ষা সহজ। বাডিং করার জন্য চারার রুটস্টক বয়স ৩
মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মধ্য-চৈত্র থেকে বৈশাখ (এপ্রিল-মে) বাডিং করার
উপযুক্ত সময়। এক্ষেত্রে সায়ন (ঝপরড়হ) সংগ্রহের উদ্দেশে নির্বাচিত জাত এবং রুটস্টক
উভয়েরই পুরানো ডাল-পালা ফাল্গুন থেকে মধ্য চৈত্র (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) মাসে ছাঁটাই
করে দিতে হয়। অতঃপর নতুন শাখাকে বাডিং-এর কাজে লাগাতে হয়।
জমি তৈরি ও চারা রোপণ:
বাগান আকারে গাছ লাগাতে হলে গভীরভাবে চাষ
দিয়ে জমি তৈরি করা উচিত। এতে দীর্ঘজীবী আগাছা দমন হবে। বাড়ির আশে-পাশে, পুকুর পাড়ে
কিংবা রাস্তার ধারে গাছ লাগালে চাষ না দিয়ে সরাসরি গর্ত করে কুলের চারা লাগানো
যায়। চারা লাগানোর জন্য ৫-৬ মিটার দূরত্বে ১ x ১ x ১ মিটার আকারের গর্ত তৈরি করতে
হবে। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে প্রতি গর্তে ২৫ কেজি পচা গোবর, ২৫০ গ্রাম
টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি এবং ২৫০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে
গর্ত বন্ধ করে রাখতে হবে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ও ভাদ্র-আশ্বিন মাস চারা রোপণের উপযুক্ত
সময়। চারা রোপণের পূর্বে গর্তের মাটি কোদাল দিয়ে উলট-পালট করে নিতে হবে। রোপণের পর
চারাটিকে একটি শক্ত খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে এবং গোড়ায় পানি দিতে হবে ।
সার প্রয়োগ:
সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও অধিক ফলনশীলতার জন্য
গাছে নিয়মিত সার প্রয়োগ অপরিহার্য। সারের মাত্রা নির্ভর করে গাছের বয়স ও মাটির
ঊর্বরতার উপর, বিভিন্ন বয়সের গাছে সারের মাত্রা বিভিন্ন। এছাড়া, অঞ্চলভিত্তিক যেসব
সারের অধিক ঘাটতি রয়েছে সে সব সারও প্রয়োগ করতে হবে। উল্লিখিত সার সমান দুই
কিস্তিতে জ্যৈষ্ঠ এবং আশ্বিন মাসে প্রয়োগ করতে হবে। সার মাটির সাথে ভালভাবে মেশাতে
হবে এবং প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে। বাড়ির আঙ্গিনা, পুকুর বা রাস্তার ধারে লাগানো গাছে
শাবল দ্বারা গর্ত করে তাতে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। গাছের গোড়া থেকে কতটুকু দূরে
এবং কতদূর পর্যন্ত সার প্রয়োগ করা যাবে তা নির্ভর করে গাছের বয়সের উপর। সাধারণত
পূর্ণ বয়স্ক গাছের গোড়া থেকে ১-১.৫ মিটার দূর থেকে শুরু করে ৩.৫ মিটার পর্যন্ত সার
প্রয়োগ করা হয়। নিম্নোক্ত ছকে গাছের বয়স অনুযায়ী গাছপ্রতি সারের পরিমাণ উল্লেখ করা
হল।
|
গাছের বয়স |
গাছপ্রতি
সারের পরিমাণ |
|||
|
গোবর (কেজি) |
ইউরিয়া (গ্রাম) |
টিএসপি (গ্রাম) |
এমওপি (গ্রাম) |
|
|
১-২ বছর |
১০ |
৩০০ |
২৫০ |
২৫০ |
|
৩-৪ বছর |
১৫ |
৫০০ |
৪০০ |
৪০০ |
|
৫-৬ বছর |
২০ |
৭৫০ |
৭০০ |
৭০০ |
|
৭-৮ বছর |
২৫ |
১০০০ |
৮৫০ |
৮৫০ |
|
৯ বা তদুর্ধ্ব |
৩০ |
১২৫০ |
১০০০ |
১০০০ |
পানি সেচ ও পরিচর্যা:
শুষ্ক মৌসুমে বিশেষত চারা গাছে এবং বয়স্ক
গাছে ফলের বাড়ন্ত অবস্থায় অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে সেচ দিলে ফলন ও ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি
পায়। চাষ দিয়ে বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কুল বাগানের আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ডালপালা ছাঁটাই:
নতুন রোপণকৃত বা কলমকৃত গাছে আদিজোড় হতে
উৎপাদিত কুঁশি ভেঙ্গে দিতে হবে। গাছটির অবকাঠামো মজবুত করার লক্ষ্যে গোড়া থেকে ১
মিটার উঁচু পর্যন্ত কোন ডালপালা রাখা চলবে না। এক থেকে দেড় মিটার উপরে বিভিন্ন
দিকে ছড়ানো ৪-৫টি শাখা রাখতে হবে যাতে গাছটির সুন্দর একটি কাঠামো তৈরি হয়। কুল
গাছে সাধারণত চলতি বছরের নতুন গজানো প্রশাখায় ভাল ফল ধরে। এজন্য প্রতিবছর ফল
আহরণের পরপরই ডাল ছাঁটাই আবশ্যক। চারা রোপণের বা কুঁড়ি সংযোজনের পর ৩/৪ বছর মধ্যম
ছাঁটাই অর্থাৎ শুধুমাত্র প্রশাখা এবং শাখার মাথার দিক থেকে ৫০-৬০ সেমি পরিমাণ
ছাঁটাই করতে হবে। গাছ কাক্সিক্ষত আকারে আসার পর এক বছর বয়সী ডাল গোড়ার দিকে ২০-৩০
সেমি পরিমাণ রেখে সম্পূর্ণ ডাল ছেঁটে দিতে হবে। এছাড়া মরা, দুর্বল, রোগাক্রান্ত
এবং এলোমেলোভাবে বিন্যস্ত ডালও ছেঁটে দিতে হবে।
কুলের রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনাঃ
কুল গাছের পাউডারী মিলডিউ রোগঃ
কুলের পাউডারী মিলডিউ একটি
মারাত্মক রোগ। এই রোগের আক্রমণে ফলন হ্রাস পায়। আয়ডিয়াম প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা এ
রোগ হয়ে থাকে। গাছের পাতা, ফুল ও কচি ফল পাউডারী মিলডিউ রোগে আক্রান্ত হয়।
আক্রান্ত ফুল ও ফল গাছ হতে ঝরে পড়ে। গাছের পরিত্যক্ত অংশ এবং অন্যান্য পোষক
উদ্ভিদে এ রোগের জীবণু বেঁচে থাকে এবং বাতাসের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। উষ্ণ ও
ভেজা আবহাওয়ায় বিশেষ করে মেঘাচ্ছন্ন অবস্থায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
প্রতিকারঃ
গাছে ফুল দেখা দেয়ার পর থিওভিট, কুমুলাস
ডিএফ নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা টিল্ট ২৫০
ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি মিশিয়ে
১০- ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
কুলের এনথ্রাকনোজ
রোগ/ শুকনো ক্ষত রোগঃ
রোগের কারণ : ছত্রাক
ক্ষতির ধরণ : দাগ শুকনো ও শক্ত। ফল ফেটে যেতে পারে। ফলে কালচে দাগ
পড়ে। ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফল শুকিয়ে যায় কেখনও কখনও অনেক দাগ একত্রিত হয়ে
ফল পচে যায়।
ফসলের যে পর্যায়ে
আক্রমণ করে : বাড়ন্ত পর্যায়
, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে
আক্রমণ করে : পাতা , ফল
ব্যবস্থাপনা :
প্রোপিকোনাজল জাতীয়
ছত্রাকনাশক (যেমন টিল্ট ৫ মিলি/ ১ মুখ) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে ১০-১২
দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। ঔষধ স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
কুলের পাতা মোড়ানো পোকা
- লক্ষণঃ
এরা পাতা মুড়িয়ে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। বড় গাছের
জন্য বেশি ক্ষতিকর না হলেও ছোট গাছকে অনেক সময় পত্রশুন্য করে ফেলতে পারে।
- ব্যবস্থাপনাঃ
১। আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাটাই করে
ধ্বংস করা।
২। গাছের নিচে পড়ে থাকা পাতা ও আবর্জনা
অপসারণ করা।
৩। রাসায়নিক কীটনাশক সুপারিশকৃত নয় তবে
আক্রমণ বেশী হলে প্রতি লিটার পানিতে সুমিথিয়ন ২ মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করা।
- সাবধানতাঃ
১। নিয়মিত পরিদর্শন
করে ব্যবস্থা নেয়া।
কুলের মিলিবাগ বা ছাতরা পোকা
- লক্ষণঃ
এরা পাতা, ফল ও ডালের রস চুষে নেয় ফলে গাছ দুর্বল হয়।
পোকার আক্রমণে পাতা, ফল ও ডালে সাদা সাদা তুলার মত দেখা যায়। অনেক সময় পিপড়া দেখা
যায়। এর আক্রমণে অনেক সময় পাতা ঝরে যায় এবং ডাল মরে যায়।
- ব্যবস্থাপনাঃ
১। আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাটাই করে
ধ্বংস করা।
২। গাছের গোড়ার মাটি থেকে 15-20 সেমি উপরে স্বচ্ছ পলিথিন দ্বারা মুড়ে দিতে হবে যাতে মিলিবাগ গাছে
উঠতে না পারে।
৩। সম্ভব হলে হাত দিয়ে ডিম ব বাচ্চার
গাদা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা।
৪। জৈব বালাইনাশক নিমবিসিডিন (0.4%)
ব্যবহার করা।
৫। আক্রমণ বেশী হলে প্রতিলিটার পানিতে
২ মিলি রগর টাফগর, সানগর বা সুমিথিয়ন ২ মিলি মিপসিন বা সপসিন মিশিয়ে স্প্রে করা।
ফল
ছিদ্রকারী উইভিল পোকাঃ
কুল
বাগানে ফল ছিদ্রকারী উইভিল পোকা ও টিউব স্পিটল বাগ পোকা অন্যতম। এ সকল পোকা কিভাবে
ক্ষতি করে এবং তা দমনে কি কি করণীয় সে বিষয়ে কিছু সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। ফল
ছিদ্রকারী উইভিল পোকা ফল ছিদ্রকারী উইভিল কুল গাছের মারাত্বক ক্ষতিকারক পোকা ।
কয়েক বছর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কুলের উন্নত জাতে এ পোকার আক্রমন দেখা যাচ্ছে।
পোকার সদ্যজাত লার্ভা হালকা হলুদ বর্ণের এবং এদের পা থাকেনা। পূর্ণ বয়স্ক পোকা গাঢ়
বাদামী থেকে কালো বর্ণের হয়। পূর্ণ বয়স্ক পোকা কচি ফলে ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে
লার্ভা ও পিউপা থেকে পূর্ণ রূপ ধারন করে। এপোকা কিভাবে কুলের ক্ষতি করে থাকে তার
লক্ষণ –
- লক্ষণঃ
১. সদ্য জাত লার্ভা কচি ফলের বীজে আক্রমন করে
এবং সমপূর্ণ বীজ খেয়ে ফেলে। আক্রান্ত ফলের নিচে কাল দাগ পড়ে এবং বীজের বৃদ্ধি বন্ধ
হয়ে যায়, ফল ছোট গোলাকার হয় এবং ফ্যাকাশে ও হলুদ বর্ণ ধারন করে। আক্রান্ত ফল গাছ
থেকে ঝরে পড়ে বা গাছ শুকিয়ে যায়।
২. আক্রান্ত ফলে পোকার লার্ভা বা পিউপা বা পূর্ণ
বয়স্ক পোকার মল দেখা যায়। ফলের ভিতরের অংশ খাওয়ার পর গোলাকার ছিদ্র করে পোকা বের
হয়ে আসে।
৩. আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে বাগানের সকল গাছের ফল
আক্রান্ত হয়। তবে আপেল কুল ও বাউ কুলে আক্রমন বেশী হয়। ৪. সাধারণত গাছে ফুল আসার
পর এ পোকার আনাগোনা দেখা যায় এবং পরাগায়নের পর গাছে ফল ধরা শুরু হলে পোকার আক্রমন
শুরু হয়।
ব্যবস্থাপনাঃ
১. কুল বাগানের আশেপাশের ঝোঁপজঙ্গল ও
আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
২. কুল গাছে অসময়ে আসা ফুল ও কুড়ি নষ্ট
করে ফেলতে হবে।
৩. গাছ ও মাটিতে পড়ে যাওয়া আক্রান্ত
ফলগুলো সংগ্রহ করে লার্ভা বা পিউপা বা পুর্ণ বয়স্ক পোকাসহ ধ্বংস করতে হবে। ৪. বেশি
আক্রান্ত এলাকায় ফুল ধরার আগেই সমস্ত বাগান ও এলাকা অনুমোদিত কার্বারাইল জাতীয়
কীটনাশক বা ডাইমেথোয়েট জাতীয় কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
৫. যেহেতু পোকাটি ফলে ডিম পাড়ে এবং
লার্ভা ফলের ভিতর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় সেজন্যে আক্রমনের আগেই পোকা দমনের ব্যবস্থা
নিতে হবে। এজন্য পরাগায়নের পর ফল ধরা শুরু হলে সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক সঠিক
মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
কুলের বাদামি
বিছা/শুঁয়া পোকাঃ
পোকা চেনার উপায়
: হালকা হলুদ রঙ্গের গায়ে হলদে রঙ্গের
শোঁঙ আছে। বড় বিছা গাঢ় বাদামি ও লাল। দেহে ঘন বাদামি লোমাবৃত। মাথা ও বুক উজ্জ্বল
হলুদ কমলা এবং পেট ধুসর রঙের। সামনের পাখা বাদামি লালচে বাদামি ছোপযুক্ত।
ক্ষতির ধরণ : পাতার উল্টো পিঠের সবুজ অংশ খেয়ে পাতাকে সাদা পাতলা
পর্দার মত করে ফেলে।এরা পুরো পাতা খেয়ে ফসলের ব্যপক ক্ষতি সাধন করে।
আক্রমণের পর্যায়
: বাড়ন্ত পর্যায়, ফলের বাড়ন্ত পর্যায়
ফসলের যে অংশে
আক্রমণ করে : পাতা
পোকার যেসব স্তর
ক্ষতি করে : কীড়া
ব্যবস্থাপনা :
সাইপারমেথ্রিন জাতীয়
কীটনাশক (যেমন: কট বা রিপকর্ড বা সিমবুসা বা ফেনম বা আরিভো ১০ ইসি ১০ মিলিলিটার)
প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর ২-৩ বার পুরো গাছে স্প্রে করুন। ঔষধ
স্প্রে করায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
সঠিক জাত নির্বাচন,
পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কুল চাষ হতে পারে একজন কৃষকের জন্য একটি
টেকসই আয়ের উৎস। জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু এই ফলটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি নিরাপদ
কৃষি উদ্যোগ।
ফল সংগ্রহ:
জাত অনুসারে মধ্য-পৌষ
থেকে মধ্য-চৈত্র (জানুয়ারি থেকে মার্চ) মাসের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। সঠিক পরিপক্ক
অবস্থায় ফল সংগ্রহ করা খুবই গুরত্বপূর্ণ। অপরিপক্ক ফল আহরণ করা হলে তা কখনই কাংখিত
মানসম্পন্ন হবে না। অতিরিক্ত পাকা ফল নরম এবং মলিন বর্ণের হয়ে যায়। এতে ফলের
সংরক্ষণ গুণ কমে যায় এবং ফল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফল যখন হালকা হলুদ বা সোনালী বর্ণ
ধারণ করবে এবং এর গন্ধ ও স্বাদ কাক্সিক্ষত অবস্থায় পৌঁছবে তখন কুল সংগ্রহ করতে
হবে। সংগ্রহকালে যাতে ফলের গায়ে ক্ষত না হয় এবং ফল ফেটে না যায় সেদিকে সতর্ক
দৃষ্টি রাখতে হবে। সকাল বা বিকেলের ঠান্ডা আবহাওয়া ফল আহরণের জন্য অধিক উপযোগী।
(সূত্র - কৃষি তথ্য সার্ভিস )