নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আরও চাপে ইরানের অর্থনীতি

 প্রকাশ: ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আরও চাপে ইরানের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বাণিজ্য অবরোধ, সম্পদ জব্দ এবং জাহাজ চলাচলে হামলার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, চলতি সপ্তাহেই ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। তার দাবি, এসব ব্যবস্থা কোনো দেশের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ হতে পারে।

এর এক দিন পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের অর্থনীতিতে কঠোর আঘাত হানার কথা বলেন। সোমবার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি তেহরানকে ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান জানান। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কোনো তাড়া নেই বলেও জানান তিনি।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংশ্লিষ্ট এক হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বলে মে মাসে জানিয়েছিল মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি)।

অবরোধ ভাঙার প্রস্তুতি ইরানের

মার্কিন চাপের মুখেও ইরান নতি স্বীকার করছে না। দেশটির কর্মকর্তারা প্রয়োজনে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যাওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।

জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবুর্গের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগানের মতে, নৌ অবরোধের কারণে ইরানের ওপর প্রচলিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সামরিক শক্তিও যুক্ত হয়েছে। ফলে দেশটির অর্থনীতিতে পণ্য সরবরাহের বাস্তব ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, তেহরানের সামনে এখন দুটি পথ—ট্রাম্প প্রশাসনের শর্ত মেনে চুক্তি করা, অথবা বন্দর অবরোধ ভাঙতে সশস্ত্র সংঘাত চালিয়ে যাওয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান দ্বিতীয় পথের দিকেই বেশি ঝুঁকছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি ইরান সরকারের আচরণ পরিবর্তন করা হয়, তাহলে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন ফারজানেগান। যুদ্ধ পুরোপুরি শুরু হলে এর খরচ শুধু ইরানের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং পুরো অঞ্চলে হামলা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হরমুজ নিয়ে অনড় তেহরান

যুদ্ধ বন্ধের পথ খোঁজার আলোচনা কার্যত থেমে থাকলেও ইরান ওমানসহ কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য সাময়িক সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমওইউতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।

এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া, তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সব ধরনের হুমকি ও সামরিক অভিযান বন্ধ করা।

যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ব্যবহৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থলপথে আমদানি বাড়াচ্ছে ইরান

যুদ্ধের আগে থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান সরকার সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোকে জরুরি পণ্য আমদানি ও মজুত বাড়ানোর কিছু ক্ষমতা দিয়েছিল।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অবরোধ মোকাবিলায় খাদ্য, ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পাকিস্তান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত দিয়ে আনার ওপর বেশি জোর দিয়েছে তেহরান। রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ক্যাস্পিয়ান সাগরপথেও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

এমওইউ অনুযায়ী জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুর দিকে কয়েক সপ্তাহ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে ইরান সুপারট্যাংকারে মজুত তেল দ্রুত রপ্তানি করার সুযোগ পায় এবং সামরিক বাহিনীও পুনর্গঠনের সময় পায়।

চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর আবার ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। চাপ বাড়াতে দেশটির স্থলপথে আমদানিও ব্যাহত করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি

দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিচ্ছিন্নতার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল। নতুন চাপ সেই সংকট আরও গভীর করছে।

প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, অনিশ্চিত ও কম মজুরির কর্মসংস্থান, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকার আগামী দুই বছরের জন্য বাজার স্থিতিশীল রাখা, মানুষের জীবিকা রক্ষা এবং জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

তবে ভিয়েনাভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাহদি ঘোদসি মনে করেন, গত ১৫ বছরের দীর্ঘ স্থবিরতা দেখিয়েছে যে সরকারের নীতির সঙ্গে এসব লক্ষ্য বাস্তবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তার মতে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত কমানোর পাশাপাশি দেশের ভেতরে অর্থবহ সংস্কার প্রয়োজন। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কঠোর নীতি থেকে সরে এসে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনারও প্রয়োজন রয়েছে।

জ্বালানিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চাপের অস্ত্র

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের অপরিশোধিত তেল কেনা বা প্রক্রিয়াজাত করা চীনের আরও কিছু ছোট বেসরকারি শোধনাগার আসতে পারে। এসব শোধনাগার ‘টিপট’ নামে পরিচিত।

ইরানি তেলের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত চীন ও হংকংয়ের ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওএফএসি ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এবার ইরান-সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনে যুক্ত বড় চীনা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এতে চীনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ কমে যাওয়া নিয়ে ওয়াশিংটন যখন বেইজিংকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

ঘোদসির মতে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী চাপের জায়গা এখনো জ্বালানি খাত। যুদ্ধ ও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দেশটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই চাপ আরও কার্যকর হতে পারে।

অবরোধ শরৎ ও শীত পর্যন্ত চললে ইরানে গুরুতর সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির ভারসাম্য নিয়ে দেশটি আগে থেকেই সমস্যায় ছিল। নতুন বিধিনিষেধে গৃহস্থালির সরবরাহ বজায় রাখতে শিল্পকারখানায় রেশনিং ও সাময়িক বন্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিও বন্ধ রয়েছে। সরকার ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ভর্তুকিযুক্ত পেট্রোলের কিছু কোটা কমিয়েছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়েও ভাবছে।

ঘোদসির মতে, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের বৈদেশিক জ্বালানি বাণিজ্যকেই বেশি টার্গেট করবে-সমুদ্রপথে পরিবহন, জাহাজ চলাচল, বীমা, অর্থ লেনদেন এবং ইরানি জ্বালানির বিদেশি ক্রেতা ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ বাড়িয়ে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement