শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে মেটার প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিক মামলা

 প্রকাশ: ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে মেটার প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিক মামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত একটি মামলার বিচার শুরু হয়েছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, শিশুদের প্ল্যাটফর্মে আসক্ত করে রাখতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ফিচার নকশা করেছে।

মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে বিচার শুরু হয়। ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সিসহ ২৯টি অঙ্গরাজ্য ২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। প্রথম ধাপে এই চার অঙ্গরাজ্যের মামলার শুনানি হচ্ছে। বাকি ২৫ অঙ্গরাজ্যের মামলার বিচার পরে হবে।

বিচারক ইভোন গনজালেজ রজার্সের আদালতে মামলাটি চলবে প্রায় ছয় সপ্তাহ। আট সদস্যের একটি জুরি থাকলেও তারা শুধু পরামর্শমূলক ভূমিকা পালন করবে। মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বিচারক রজার্স।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও'নিল উদ্বোধনী বক্তব্যে অভিযোগ করেন, মেটা এমনভাবে তাদের পণ্য তৈরি করেছে, যাতে ব্যবহারকারীদের যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখা যায়, তাদের তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং এসবের ক্ষতিকর দিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা যায়।

তার ভাষ্য, এই কৌশল শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে।

শিশুদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ

অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলায় বলা হয়েছে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে মেটার ভূমিকা রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, শিশুদের প্ল্যাটফর্মে আসক্ত করতে কোম্পানিটি জেনেশুনে বিভিন্ন ফিচার তৈরি করেছে এবং এর ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতির কথা জনসাধারণের কাছ থেকে আড়াল করেছে।

এ ছাড়া ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের অভিভাবকের সম্মতি ছাড়াই নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অঙ্গরাজ্যগুলো বলছে, এটি ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন।

চার অঙ্গরাজ্য মেটার কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছে তারা।

অভিযোগ অস্বীকার মেটার

মেটা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। আদালতে কোম্পানিটির আইনজীবী পল শ্মিট বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কিছু মানুষের সমস্যা তৈরি হয়—এ নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। তবে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে তাদের সামগ্রিক সুস্থতার ঘাটতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে-এমন স্পষ্ট প্রমাণ গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গও সেবাগুলো উন্নত করতে চান, সেগুলোকে বিপজ্জনক করে তুলতে নয়।

মেটার দাবি, অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি নেই। কিশোরদের সুরক্ষায় কোম্পানি এরই মধ্যে নানা ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা। এর মধ্যে ২০২৪ সালে চালু করা ইনস্টাগ্রাম টিন অ্যাকাউন্টস রয়েছে, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করতে পারবে, তা সীমিত করা হয়েছে। অভিভাবকদের ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।

মেটার মুখপাত্র স্টেফানি ওটওয়ে বলেন, অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা মামলাটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বললেও তাদের অভিযোগের ভিত্তি নেই এবং আর্থিক দাবিও বাস্তবতার তুলনায় অত্যন্ত বেশি।

সাবেক প্রকৌশলীর সাক্ষ্য

উদ্বোধনী বক্তব্যের পর অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন মেটার সাবেক নিরাপত্তা প্রকৌশলী আর্তুরো বেহার। শিশুদের নিরাপত্তায় মেটার ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলো কার্যকর নয়—কোম্পানিটি বিষয়টি জানত বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন তিনি। এর আগে চারটি মামলাতেও মেটার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন বেহার।

তার সাক্ষ্য বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল মেটা। কোম্পানির দাবি ছিল, সাবেক কর্মীদের সঙ্গে সিগন্যাল অ্যাপে আদান-প্রদান করা কিছু বার্তা তিনি মুছে ফেলেছেন। তবে বিচারক রজার্স সেই আবেদন নাকচ করেন।

আদালতে বেহার বলেন, মেটায় ‘দ্রুত এগিয়ে যাও এবং সবকিছু ভেঙে ফেলো’ ধরনের মানসিকতা ছিল। ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে কোম্পানি অনেকটা ‘জিজ্ঞেস করো না, জানার চেষ্টা করো না’ নীতি অনুসরণ করত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, রিলসের মতো বিভিন্ন পণ্য বাজারে চালুর সময় সেগুলোর নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

মামলায় মেটার প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিরও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

ক্ষতির অঙ্ক হতে পারে বিপুল

মামলায় মেটা দায়ী সাব্যস্ত হলে বিচারক প্রতিষ্ঠানটির ওপর দেওয়ানি জরিমানা আরোপের পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কার্যক্রমে পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন।

মেটার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা কোম্পানিটির প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের কাছাকাছি। তবে ২৯ অঙ্গরাজ্যের জোট প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা চেয়েছে।

নিউ মেক্সিকোর পৃথক একটি মামলায় মেটাকে ইতিমধ্যে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মার্চে জুরি রায়ে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার এবং চলতি মাসের শুরুতে বিচারকের আদেশে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়।

মেটা জানুয়ারিতে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে দেওয়া নথিতে স্বীকার করেছে, শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তিসহ বিভিন্ন মামলায় তাদের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা দিতে হতে পারে।

একের পর এক মামলা

২০২১ সালে মার্কিন সিনেটের একটি শুনানি থেকে বর্তমান মামলার সূত্রপাত। ওই শুনানিতে ফেসবুকের সাবেক ডেটা বিজ্ঞানী ও হুইসেলব্লোয়ার ফ্রান্সেস হাউগেন অভিযোগ করেছিলেন, বেশি মুনাফার লক্ষ্যে কোম্পানিটি জেনেশুনে এমন পণ্য তৈরি ও প্রচার করছে, যা তরুণ ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

মেটা একাধিকবার মামলাটি আদালতে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালেও তারা এ উদ্যোগ নেয়। সর্বশেষ গত জুনে বিচার ছাড়াই মামলা নিষ্পত্তির জন্য সারসংক্ষেপ রায়ের আবেদন করেছিল কোম্পানিটি। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ না করায় মামলাটি বিচারে গড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে শক্তিশালী মামলা থাকলেও মেটা শিশুদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়েই প্ল্যাটফর্ম নকশা করেছিল—এমন অভিপ্রায় প্রমাণ করাই তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মামলা শুরুর প্রভাব পড়েছে মেটার শেয়ারবাজারেও। মঙ্গলবার দিনের বেশির ভাগ সময় মেটার শেয়ারের দাম কম ছিল। দিন শেষে শেয়ারটির দর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৫৪৩ দশমিক ৬৭ ডলারে দাঁড়ায়।

মেটার বিরুদ্ধে এই মামলাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চলমান একাধিক আইনি লড়াইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়। গুগলের ইউটিউব, টিকটক ও স্ন্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও তরুণদের ক্ষতি, শিশুদের তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ এবং ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে রাখার উদ্দেশ্যে প্ল্যাটফর্ম নকশার অভিযোগে মামলা চলছে।

মামলা শুরুর দিন আদালতের বাইরে জড়ো হন শিশু সুরক্ষাকর্মী ও কয়েকজন অভিভাবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতির সঙ্গে নিজেদের সন্তানদের মৃত্যুর যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করা এসব অভিভাবকের অনেকে সন্তানদের ছবি হাতে নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

তাদের মধ্যে মেরি রোডিও ছিলেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালে ফেসবুকে এক শিকারির হাতে নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে রাইলি ব্যাসফোর্ড আত্মহত্যা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতির বিষয়ে কোম্পানিগুলোর দায় নিয়ে চলমান বিতর্কে তার পরিবারের ঘটনাটিও নতুন করে সামনে এসেছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement