ভেনেজুয়েলার অর্ধেক তেল এখন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারে

 প্রকাশ: ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ভেনেজুয়েলার অর্ধেক তেল এখন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ভেনেজুয়েলার মোট তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই এখন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদনের মধ্যে ৫ লাখের বেশি ব্যারেল যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার হিউস্টনে একটি শিল্প সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি কাইল হাউস্টভেইট বলেন, ভেনেজুয়েলা থেকে এখন দৈনিক ৫ লাখের বেশি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে। এসব তেল এমন শোধনাগারে যাচ্ছে, যেগুলো বিশেষভাবে এই ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য তৈরি।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটির মজুতের পরিমাণ আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির উৎপাদন বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ১ শতাংশে নেমে এসেছিল।

২০২৫ সালের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলা দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিল দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল।

ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলো এই ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার উপযোগী করে তৈরি হওয়ায় ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি বাড়লে এসব শোধনাগার সরাসরি লাভবান হচ্ছে।

‘সুন্দর জ্বালানি অংশীদারত্ব’

হাউস্টভেইট বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতেও ওয়াশিংটন সহায়তা করছে। ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে মেশানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলায় দৈনিক ১ লাখ ব্যারেলের বেশি ন্যাফথা পাঠাচ্ছে।

তিনি এই ব্যবস্থাকে ‘সুন্দর জ্বালানি অংশীদারত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যেই বাস্তব মূল্য তৈরি হচ্ছে।

সম্মেলনে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারাও উৎপাদন আরও বাড়ানোর আশাবাদ জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভান্নি মার্তিনেজ বলেন, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ১২ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাবে। চলতি বছরে দেশটির তেল রপ্তানি ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

মার্তিনেজের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি উৎপাদন ১২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সরবরাহ বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সংস্কারের জন্য ভেনেজুয়েলা বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এখন সেই উদ্যোগের বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চায়। দেশটির শোধনাগারগুলো উন্নত, আধুনিক ও সম্প্রসারিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি। ভারী অপরিশোধিত তেলের জন্য প্রয়োজনীয় মিশ্রণ উপাদান বা ডাইলুয়েন্টও দেশেই উৎপাদনের ওপর জোর দেন তিনি।

তেল বিক্রির অর্থ নিয়ে প্রশ্ন

ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং দেশটির তেলসম্পদ কাজে লাগাবে।

মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পরের দিনগুলোতে ট্রাম্প বলেছিলেন, তেল বিক্রির অর্থ তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তা ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসকে জানান, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ এমন একটি হিসাবে জমা হবে, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি করবে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারকে ওই হিসাব থেকে মাসিক বাজেটের জন্য আবেদন করতে হবে এবং কোন খাতে অর্থ ব্যবহার করা যাবে না, তা ওয়াশিংটন আগেই নির্ধারণ করবে।

জুলাইয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। ২৭ জুলাই ওই প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, প্রকৃত অঙ্ক আরও বেশি।

তবে ওই অর্থের কী হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এপ্রিলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ

স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জুনে বলেছিল, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন দুই দেশের জন্যই লাভজনক হিসেবে তুলে ধরলেও কত তেল বিক্রি হয়েছে, কত রাজস্ব এসেছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ভেনেজুয়েলার সোনা ও অন্যান্য খনিজ রপ্তানি নিয়েও একই ধরনের স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে রয়েছে ওই অন্তর্বর্তী সরকার।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মতে, জবাবদিহির ব্যবস্থা ও স্পষ্ট গণতান্ত্রিক রূপরেখা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় একটি দুর্নীতিগ্রস্ত উত্তরসূরি সরকারকে আরও শক্তিশালী করার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী শিবিরের মধ্যে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোও রয়েছেন। মে মাসে বিরোধীরা একটি নতুন রূপরেখায় সম্মত হয়, যেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন এবং রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement