সংবাদ শিরোনাম

ইসরায়েলি অবরোধে পশ্চিম তীরে চিকিৎসাসেবা ভয়াবহ সংকটে

 প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি অবরোধে পশ্চিম তীরে চিকিৎসাসেবা ভয়াবহ সংকটে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেওয়ার পর থেকে অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে নাবলুস, রামাল্লাহ ও বেথলেহেমসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সামরিক চেকপয়েন্ট ও সড়ক অবরোধের কারণে অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে। ফলে জরুরি রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই সংকটজনক পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন তারা। ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্সচালক ইউসুফ দিরিয়া জানান, আগে ২০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিলেও এখন একই গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ঘুরতে হচ্ছে। পূর্বানুমতি থাকলেও প্রতিটি চেকপয়েন্টে পরিচয়পত্র, অ্যাম্বুলেন্স ও যাত্রীদের বারবার তল্লাশির পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার ভাষায়, প্রতিটি মিনিট রোগীর জীবনের জন্য মূল্যবান, অথচ সেই সময়ই নষ্ট হচ্ছে চেকপয়েন্টে।

এই অবরোধের ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গর্ভবতী নারী ও সংকটাপন্ন রোগীদের ওপর। সোমবার ভোরে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে গুরুতর রক্তক্ষরণ অবস্থায় নাবলুসে নেওয়ার পথে আধা ঘণ্টার বেশি সময় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে ইসরায়েলি সেনারা। চালকের দাবি, অ্যাম্বুলেন্সের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে বাধ্য করায় চিকিৎসা সরঞ্জামও বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ওই নারীর গর্ভের শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে জুলাই মাসেই রামাল্লাহর কাছে তিন মাস বয়সী এক শিশুকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সামরিক গেট খুলে না দেওয়ায় তার মৃত্যু হয়। একই মাসে সিনজিল এলাকায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত এক নারীও অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার কারণে প্রাণ হারান বলে অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, পশ্চিম তীরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন মারাত্মক সংকটে। ইসরায়েলের কর রাজস্ব আটকে রাখা, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি এবং চলাচলে বাধার কারণে হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পুরো পশ্চিম তীরে প্রায় ৯২৫টি চলাচল-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা প্রায় ৩৪ লাখ ফিলিস্তিনির দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। মানবাধিকার সংস্থা ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েলের গবেষক ইমরান আনাতি বলেন, পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং এটি এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই পশ্চিম তীরে হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী ও অ্যাম্বুলেন্সের ওপর ২৩৩টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।


নাবলুসের কাছে আকরাবা গ্রামের একটি ছোট ক্লিনিকে অবরোধের কারণে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে একই রাতে দুই গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসব করেন। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকলেও স্থানীয় চিকিৎসকের স্ত্রী, যিনি একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, বাধ্য হয়ে ক্লিনিকেই প্রসব করান। পরে এক প্রসূতির অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে দীর্ঘ সমন্বয়ের পর তাকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয়। অ্যাম্বুলেন্সচালক ইউসুফ দিরিয়া বলেন, ইসরায়েলি নম্বরপ্লেটধারী অ্যাম্বুলেন্স সহজেই চেকপয়েন্ট পার হলেও ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্সকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। তার কথায়, একজন চিকিৎসাকর্মী হিসেবে তিনি মানুষ বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু শুধু ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণে এই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি শুধু রোগীদের জীবনই নয়, চিকিৎসাকর্মীদের মানসিক অবস্থাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement