জিম্বাবুয়ের খনিজ নীতিতে ছোট উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হারারে, জিম্বাবুয়ে-নিজেদের খনিজ সম্পদ থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ে কাঁচা খনিজ রপ্তানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে জিম্বাবুয়ে। তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খনি উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা না পেলে তারা নতুন শিল্পায়নের ধারার বাইরে পড়ে যেতে পারেন।
দেশটির সরকার লিথিয়ামসহ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অপরিশোধিত আকরিক রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকারের যুক্তি, কাঁচা খনিজ বিদেশে পাঠিয়ে অন্য দেশকে পরিশোধন ও উৎপাদনের মাধ্যমে অধিক মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে সেই মূল্য সংযোজন নিজ দেশেই হওয়া উচিত।
সরকারি কর্মকর্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই নীতির ফলে জিম্বাবুয়ের লিথিয়াম খাতে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে ক্ষুদ্র খনি মালিকদের দাবি, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের বিপুল ব্যয়, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৭ জুলাই মাশোনাল্যান্ড ইস্টের গোরোমোনজিতে প্রসপেক্ট লিথিয়াম জিম্বাবুয়ে (পিএলজেড) পরিদর্শনের সময় দেশটির খনি ও খনিজ উন্নয়নমন্ত্রী পলাইট কাম্বামুরা বলেন, ২০২২ সালে অপরিশোধিত লিথিয়াম আকরিক রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর দেশীয় প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, আফ্রিকার প্রথম লিথিয়াম সালফেট কারখানা এখন জিম্বাবুয়েতেই গড়ে উঠেছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু লিথিয়াম সালফেট বা লিথিয়াম কার্বোনেট উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতে দেশে লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌর প্যানেল তৈরির শিল্পও গড়ে তোলা।
চীনের ঝেজিয়াং হুয়াইউ কোবাল্টের মালিকানাধীন পিএলজেড জানিয়েছে, তাদের লিথিয়াম কার্বোনেট কারখানার নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা পেশেন্স মুশোরে বলেন, হুয়াইউর বিনিয়োগ জিম্বাবুয়ের জন্য ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে এবং দেশের লিথিয়াম মূল্য শৃঙ্খল সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।
জননীতি বিশ্লেষক টেডিয়াস এনকিউবের মতে, লিথিয়াম খাতের অভিজ্ঞতাই দেখিয়েছে কেন সরকার মূল্য সংযোজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, আর্কাডিয়া মাইন ও বিকিতা মিনারেলসের মতো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ দেশে দক্ষ জনবল তৈরি, স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং খনিজ সম্পদ থেকে আয়ের বড় অংশ দেশের ভেতরে ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ ভিন্ন। নাইভো মাইনিংয়ের ব্যবসা উন্নয়ন পরিচালক শেলটন লুকাস বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ক্রোম, অ্যান্টিমনি ও টাংস্টেন নিয়ে কাজ করলেও সাশ্রয়ী মূল্যে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য, কাঁচা ক্রোম এখন স্থানীয় চীনা মালিকানাধীন স্মেল্টারগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হতে হচ্ছে, যেখানে ন্যায্য দাম মিলছে না। অ্যান্টিমনি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নির্মাণের সামর্থ্য থাকলেও ক্রোমের জন্য একই ধরনের স্থাপনা গড়তে বিপুল ব্যয় বড় বাধা।
লুকাসের প্রস্তাব, সরকার বা শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে টোল-স্মেল্টিং সুবিধা গড়ে তুলতে পারে। এতে ক্ষুদ্র খনি উদ্যোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে সেই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন এবং নিজেদের খনিজের মালিকানাও বজায় থাকবে।
তার মতে, কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তারা ক্ষুদ্র খনি মালিকদের ওপর মূল্য নির্ধারণের চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, যা পুরো খাতের জন্য ক্ষতিকর হবে।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জিম্বাবুয়িয়ান অর্থনীতিবিদ চেনাই মুতাম্বাসেরে মনে করেন, সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদের অর্থায়ন, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাব বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে নয়, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব প্রণোদনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে এই নীতিকে কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া কাঁচা খনিজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে অবৈধ খনন ও খনিজ পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তথ্য, প্রচার ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব নিক মাঙ্গওয়ানা বলেন, সীমিত খনিজ সম্পদ থেকে দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতেই সরকার এই নীতি বাস্তবায়ন করছে। তার ভাষ্য, লিথিয়ামের পাশাপাশি প্যালাডিয়াম, রোডিয়াম, রুথেনিয়াম, ইরিডিয়াম ও অসমিয়ামসহ প্লাটিনাম গ্রুপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজও একই নীতির আওতায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদসমৃদ্ধ অনেক দেশের মতো জিম্বাবুয়ের সামনেও এখন বড় প্রশ্ন-কাঁচা খনিজ রপ্তানি সীমিত করে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলেও সেই সুফল কি পুরো খাতের উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে, নাকি কেবল বড় কোম্পানিগুলোর হাতেই কেন্দ্রীভূত হবে।
শেলটন লুকাসের মতে, মূল্য সংযোজন নীতি এমন হওয়া উচিত, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাধা তৈরি না করে শিল্পায়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথ আরও বিস্তৃত করে।
সূত্র: আলজাজিরা