সংবাদ শিরোনাম

কঙ্গোয় ইবোলা ভয়াবহ, মৃত ছাড়াল ১৩শ জন

 প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কঙ্গোয় ইবোলা ভয়াবহ, মৃত ছাড়াল ১৩শ জন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) ইবোলার সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫৪ জনে পৌঁছেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫ জনে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের গতি ও মৃত্যুহারের দিক থেকে এটি এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এই কারণে যে, ডিআরসিতে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ইবোলার বিরল ‘বান্ডিবুগিও’ ধরন, যার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা নেই।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুলসালামি নাসিদি আল জাজিরাকে বলেন, কার্যকর টিকার অভাবে ভাইরাসটি ‘দাবানলের মতো’ ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে এবং সীমিত জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

এদিকে সংক্রমণ ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা দ্রুত টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপ শুক্রবার পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি নতুন একটি টিকার প্রথম ডোজ একজন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে প্রয়োগ করেছে। গবেষণাটির প্রধান গবেষক ক্যাটরিনা পোলক একে বান্ডিবুগিও ইবোলাভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা উন্নয়নের বহুজাতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেছেন।

ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায়। গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে ছড়িয়ে পড়া সেই মহামারিতে অন্তত ২৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তখন প্রথম এক হাজার মৃত্যুর মাইলফলকে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস লেগেছিল। বিপরীতে, ডিআরসির বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ১০ সপ্তাহেরও কম সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জ্যাঁ কাসেয়া গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে পরিণত হতে পারে।

ডিআরসির গোমা শহর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক আলাঁ উয়াইকানি জানান, সরকারের সমন্বয়হীন ও ধীরগতির পদক্ষেপে চিকিৎসাকর্মীরা চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন। শনিবারও একজন চিকিৎসক ও একজন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মে মাসে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের সংকটের পাশাপাশি অনেক এলাকায় রোগটির অস্তিত্ব নিয়েও মানুষের মধ্যে সন্দেহ থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল ইতুরি প্রদেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে অনাদায়ী বেতন ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত সপ্তাহে বুনিয়ার কাছে রুয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালের কর্মীরা কর্মবিরতি পালন করেন। শনিবার একই ধরনের ধর্মঘট শুরু হয় বুনিয়া শহরের এলিকিয়া ইবোলা ট্রিটমেন্ট সেন্টারে। প্রায় ১০০ কর্মী বকেয়া ভাতা পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মনোবল ভেঙে পড়ছে এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক এলাকায় এখনো স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারছেন না। বর্তমানে পরিচিত সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশকে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও প্রত্যন্ত সব গ্রামে এখনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না।


এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সম্প্রতি ডিআরসি সফর করে আসা ভ্রমণকারীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যদিও মে মাসে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ধরনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেনি। তেদ্রোস পূর্বাঞ্চলীয় সংঘাত বন্ধে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শুধু চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নির্বিঘ্ন প্রবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক উদ্যোগও সমানভাবে প্রয়োজন।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement