পরীক্ষা ফাঁস বিক্ষোভে পদত্যাগ শিক্ষামন্ত্রীর, উল্লাস দেশজুড়ে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন অভিজিৎ দিপকে—“সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?” মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেওয়া ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তোলে। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে টানা আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা আসে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল।
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের সমাবেশে মাইক্রোফোন হাতে দিপকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, “আমরা পেরেছি, আমরা সফল হয়েছি।” তখন সেখানে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। পরে তিনি প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের নাম পড়ে শোনান এবং আন্দোলনের এই সাফল্য তাঁদের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করেন।
পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিক্ষোভস্থলে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। ১৯ বছর বয়সী আন্দোলনকারী লাভান্যা ভারতী বলেন, “আমাদের অলস, বেকার বলা হয়েছিল। কিন্তু সংসদ সড়কে দিনের পর দিন অবস্থান করার মতো ‘অলস’ আমরাই। আমরা সেই ভয় ভেঙে দিয়েছি, যা বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা হয়েছিল।”
ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করার পরই সেই মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গড়ে ওঠে। নামটি ক্ষমতাসীন বিজেপির আদ্যক্ষরের সঙ্গেও ইঙ্গিতপূর্ণ মিল রেখে বেছে নেওয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর সিজেপি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। সংগঠনটির দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে ছিল প্রশ্নফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং বিক্ষোভে হামলার জন্য পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা।
গত ২০ জুলাই পার্লামেন্টমুখী মিছিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও বলপ্রয়োগ করলে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়ে। বেঙ্গালুরু, জয়পুর, লখনউ, মুম্বাই ও পাটনাসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
বিহারের বেগুসরাই থেকে প্রায় ১ হাজার ১২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়া ২৫ বছর বয়সী মেহেদী হাসান বলেন, “এক মাস ধরে যন্তর মন্তরে অবস্থান করেছি। এখন আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা সরকারকে দেখিয়ে দিয়েছি, রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীন নয়।”
১৮ বছর বয়সী শ্রুতি বেদির মতে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ শিক্ষার্থীদের বড় অর্জন হলেও এটিই শেষ নয়। তাঁর ভাষায়, “শুধু একজন মন্ত্রীর বিদায় যথেষ্ট নয়। পুরো ব্যবস্থার সংস্কার দরকার। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো-মানুষ আবার নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পেয়েছে।”
আন্দোলনকারীদের অনেকের হাতেই ছিল জাপানি মাঙ্গা ওয়ান পিস। বৈষম্য, বেকারত্ব ও পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জেনারেশন জেডের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে এই মাঙ্গাটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময়ে কোনো বড় জনআন্দোলনের চাপের মুখে এ ধরনের মন্ত্রিসভা পর্যায়ের পদত্যাগের ঘটনা এটিই প্রথম বলে পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন। তাঁদের মতে, জেনারেশন জেডের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার সরকারের ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি করেছে।
বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে দিপকের সেই প্রথম প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয় এক বাক্যে-“আজ আমরা জেনে গেলাম, তেলাপোকারা এক হলে কী ঘটে।”
সূত্র:আলজাজিরা