পশ্চিম তীরের শিশুদের স্বপ্ন তুলে ধরেছে হাউস অব হোপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে যুদ্ধ, দখলদারত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের জীবন, তাদের মানসিক লড়াই এবং শিক্ষার মাধ্যমে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার সংগ্রাম উঠে এসেছে নতুন প্রামাণ্যচিত্র হাউস অব হোপ-এ। চলচ্চিত্রটি আবর্তিত হয়েছে ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ মানার ওয়াহাব ও তাঁর স্বামী মিলাদ ভোসগুয়েরিচিয়ানের প্রতিষ্ঠিত একটি ওয়ালডর্ফ-অনুপ্রাণিত বিদ্যালয়কে ঘিরে, যেখানে শিশুদের সৃজনশীলতা, আত্মমর্যাদা এবং মানসিক বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চলচ্চিত্রটির এক আবেগঘন দৃশ্যে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষের কোণে ভেঙে পড়ে কাঁদছেন মানার ওয়াহাব। সেই মুহূর্তেও ক্যামেরা চলতে থাকে। পরিচালক মারজোলেইন বুস্ত্রা জানান, এমন ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করা সহজ ছিল না। তবে মানারের সম্মতিতেই দৃশ্যটি রাখা হয়েছে, যাতে দর্শক তাঁর বাস্তব সংগ্রামকে কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।
প্রায় ১৮ বছর আগে পশ্চিম তীরে একটি চলচ্চিত্র কর্মশালায় মানারের সঙ্গে পরিচয় হয় বুস্ত্রার। পরে তিন বছর ধরে তিনি নয়বার পশ্চিম তীরে গিয়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনি টিমের সহায়তায় প্রামাণ্যচিত্রটির শুটিং করেন। শুরুতে বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই কাজ শুরু হলেও খুব দ্রুতই পরিচালকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই গল্পের মূল শক্তি মানারের ব্যক্তিগত সংগ্রাম, তাঁর আশা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলার মানসিকতা।
আল-ইজারিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হাউস অব হোপ ভিশন কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড স্কুল ওয়ালডর্ফ শিক্ষাদর্শ অনুসরণ করে। বিদ্যালয়টিতে অহিংস প্রতিরোধ, সৃজনশীল শিক্ষা এবং শিশুদের অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিচালক বলেন, এই প্রতিষ্ঠান শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়; এটি এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে দখলদারত্ব শিশুদের অন্তর্জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং তারা স্বাভাবিক শৈশবের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়।
মানার ওয়াহাব বলেন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও মানসিক পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘হাউস অব হোপ শুধু একটি স্কুল নয়; এটি একটি ধারণা, একটি দায়বদ্ধতা এবং এমন এক শক্তি, যা আমরা যেখানেই যাই সঙ্গে বহন করি।’
তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অহিংসার দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, সহিংসতা সহজ পথ হলেও অহিংসা অনুসরণ করতে সাহস, ধৈর্য, আত্মসংযম এবং গভীর মানবিক চেতনার প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়ে যখন ভয়, ক্ষোভ ও সহিংসতা বাড়ছে, তখন মানুষের ভেতরে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রভাব পশ্চিম তীরেও আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেই সময়ও শুটিং চালিয়ে যায় নির্মাতা দল। বুস্ত্রা বলেন, যুদ্ধের আগে যে গল্পটি তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন, সেটি একই থাকলেও ৭ অক্টোবরের পর বাস্তবতা অনেক ভারী হয়ে যায়। বিদ্যালয়টি শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুললেও দখলদারত্বের বাস্তবতা প্রতিনিয়ত সেই নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
চলচ্চিত্রে এমন একটি দৃশ্যও রয়েছে, যেখানে মানার তাঁর ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর আগে ফোনের চার্জার ও অতিরিক্ত কাপড় নিতে মনে করিয়ে দেন। কারণ, যেকোনো সময় দীর্ঘ সময়ের জন্য কোনো চেকপয়েন্টে আটকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মধ্যে পশ্চিম তীরে শিশুদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাও পরিবারগুলোর স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মানার ওয়াহাবের আশা, এই প্রামাণ্যচিত্র পশ্চিমা বিশ্বের দর্শকদের ফিলিস্তিন সম্পর্কে প্রচলিত একপেশে ধারণা বদলাতে সাহায্য করবে। তাঁর মতে, সংবাদমাধ্যমে সাধারণত সহিংসতার ছবিই বেশি উঠে আসে, অথচ মানুষের প্রতিদিনের জীবন, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং মানবিক দিকগুলো আড়ালেই থেকে যায়। তিনি চান, দর্শকরা ফিলিস্তিনকে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার আলোকে দেখুক।
পরিচালক মারজোলেইন বুস্ত্রাও একই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, তিনি চান দর্শক ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’-এই বিভাজনের বাইরে গিয়ে এমন এক মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত হোক, যা অনিরাপদ পৃথিবীতে প্রিয়জনকে রক্ষা করার সার্বজনীন অনুভূতির কথা বলে।
হাউস অব হোপ ২০২৬ সালের মে মাসে হট ডকস কানাডিয়ান আন্তর্জাতিক প্রামাণ্যচিত্র উৎসবে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতেছে। সম্প্রতি এটি প্যারিসে ইউনেসকোতে প্রদর্শিত হয়েছে এবং শিগগিরই জেরুজালেম আরব চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হবে। নির্মাতাদের বিশ্বাস, পশ্চিম তীরের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এই চলচ্চিত্রের মানবিক বার্তা বিশ্বের সব মানুষের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক।
সূত্র:আলজাজিরা