হুথি হামলায় সৌদি তেল স্থাপনায় উত্তেজনা চরমে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। তেহরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বাহিনী লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুথি বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি জানান, সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর জিজান ও ইয়ানবুর স্থাপনা লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। জিজানের শোধনাগারে হামলার পর সেখান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেলেও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি। অন্যদিকে, ইয়ানবুতে নিক্ষেপ করা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র গ্রিস পরিচালিত প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে বলে জানা গেছে।
গত ১১ জুলাই থেকে টানা ১৩ রাত ইরানে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী ট্যাংকারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হামলার পরই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তিকে উভয় পক্ষ কার্যত অকার্যকর ঘোষণা করে এবং পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার লক্ষ্যে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনিশ্চয়তায় পড়ে।
তবে শুক্রবারের পর থেকে ইরানে নতুন কোনো মার্কিন বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়নি। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। যদিও মৌলিক মতপার্থক্য ও গভীর অবিশ্বাসের কারণে আলোচনায় এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে তেল ও সার উৎপাদনের কাঁচামাল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
এদিকে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার পুরোনো সংঘাতও আবার তীব্র হয়েছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি চলতি মাসে ভেঙে যায়। সানার বিমানবন্দরে একটি ইরানি উড়োজাহাজের অবতরণ ঠেকাতে চালানো হামলার পর হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এরপর গত সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে তারা। এর জবাবে শুক্রবার হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা শহরে বিমান হামলা চালায় সৌদি বাহিনী।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব-দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একসঙ্গে অচল হলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
এদিকে সংঘাতের আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে কাস্পিয়ান সাগরে। শনিবার সেখানে একটি ইরানি জাহাজে দূরপাল্লার হামলায় একজন নাবিক নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনার জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত কূটনীতিককে তলব করেছে ইরান।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেছেন, কাস্পিয়ান সাগরে পরিচালিত দূরপাল্লার হামলায় সামরিক মালামাল বহনকারী ইরানি জাহাজ এবং একটি যুদ্ধজাহাজে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে রাশিয়া উপসাগরীয় দেশগুলো ও সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনার স্যাটেলাইট তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে, যাতে আইআরজিসি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিমান হামলা হঠাৎ বন্ধ হওয়ার কারণ প্রকাশ করেননি। তবে রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কূটনৈতিক সমাধানই এখনো ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার। ট্রাম্পও শুক্রবার জানান, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং তেহরান সমঝোতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র: আলজাজিরা