যৌন অসদাচরণ অভিযোগে অপসারিত আইসিসি প্রসিকিউটর করিম খান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানকে অপসারণ করেছে আদালতের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ (এএসপি)। শুক্রবার অনুষ্ঠিত ভোটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে করিম খানের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এই অপসারণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র চাপের মুখে ছিল আইসিসি। ট্রাম্প প্রশাসন করিম খানসহ আদালতের কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে।
করিম খানের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া আইনজীবী তায়্যাব আলী বলেন, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর (ইউএন অফিস অব ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেস)-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বিচারিক প্যানেল সর্বসম্মতিক্রমে মত দেয় যে, প্রাসঙ্গিক আইনি কাঠামোর আওতায় করিম খানের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা দায়িত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাঁর ভাষ্য, আদালতের নির্বাচিত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বা প্রক্রিয়াগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে অপসারণ করা হলে আইসিসির স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্বাধীন বিচারিক পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এবং করিম খান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অবস্থায় তাঁকে নির্বাহী ভোটের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগও দেওয়া হয়নি।
প্রায় দুই বছর আগে প্রথম অভিযোগ ওঠার পর গত জুনে একটি তদারকি প্যানেল করিম খানের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সুপারিশ করলে তিনি পদ ছাড়েন। শুক্রবারের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক অপসারণ সম্পন্ন হলো।
আইসিসি জানিয়েছে, নতুন প্রসিকিউটর নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত উপপ্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান ও মামে মানদিয়ায়ে নিয়াং যৌথভাবে প্রসিকিউটরের দপ্তরের দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন প্রসিকিউটর নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও আগামী বছরের আগে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা নারী, যাঁকে শুধু ‘সারা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, করিম খান ধীরে ধীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও শারীরিক হয়রানিমূলক আচরণ শুরু করেন। তিনি একটি ঘটনার বর্ণনায় বলেন, ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকার সময়ও করিম খান তাঁকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন। তবে করিম খান শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অন্যায্য এবং পর্যাপ্ত প্রমাণবিহীন।
করিম খানের অপসারণের ফলে ২০২৪ সালে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ওপর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, ওই পরোয়ানা প্রত্যাহারের ক্ষমতা কেবল আইসিসির বিচারকদের হাতে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই দাবি করেন, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতেই করিম খান ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, করিম খানের ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ায় নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে মামলার বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসে ফিলিস্তিনি মিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, করিম খানকে অপসারণের সিদ্ধান্তকে ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত চলমান তদন্ত বা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা অত্যন্ত কৌশলী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আইসিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রসিকিউটরের দপ্তর রোম সংবিধির আওতাভুক্ত সব মামলায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে, যাতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান।
সূত্র:আলাজাজিরা