পশ্চিম তীরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে ইসরায়েলের নতুন অভিযান শুরু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। শুক্রবার নাবলুস শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে তাল এলাকায় ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন ফিলিস্তিনি এবং দুজন ইসরায়েলি সেনাসদস্য রয়েছেন।
ফিলিস্তিনি সূত্রের দাবি, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি হাভাত গিলাদের কাছে অবস্থিত তাল গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষায় এগিয়ে এলে বসতি স্থাপনকারীরা গুলি চালায়। এতে আরও চারজন ফিলিস্তিনি আহত হন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। আহত হয়েছেন দুজন ইসরায়েলিও।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, ওই এলাকায় ভ্রমণে যাওয়া ইসরায়েলিদের ওপর হামলার খবর পেয়ে সেনা মোতায়েন করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক ফিলিস্তিনি স্থানীয় নিরাপত্তা সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালান। এতে কয়েকজন ইসরায়েলি আহত হন। সেনাবাহিনী জানায়, ঘটনাস্থলেই চার ফিলিস্তিনি নিহত হন, যার মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিও ছিলেন।
ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে অভিযানের নির্দেশ দেন। এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পশ্চিম তীরে বড় ধরনের ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেয়। সেনারা নাবলুস ঘিরে ফেলে এবং এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। সেনাবাহিনী আরও জানায়, তাদের অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
নেতানিয়াহু একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে কৃষিভিত্তিক আউটপোস্ট বৈধ করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং নতুন আউটপোস্ট স্থাপনের ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক আইনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি অবৈধ। আর রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ছাড়া গড়ে ওঠা আউটপোস্টগুলো ইসরায়েলের নিজস্ব আইনেও সাধারণত অবৈধ হিসেবে বিবেচিত।
তাল এলাকার ফাতাহ নেতা ইসসাম সাইফি রয়টার্সকে জানান, প্রথমে ২৫ থেকে ৩০ জন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী গ্রামের পূর্বাংশে দুটি বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা বাধা দিলে তারা গুলি চালান। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তারা আবার গ্রামের পশ্চিমাংশে ফিরে এসে হামলা চালায় এবং এক শিশুকে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে এসে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে গুলি চালায় বলে তার অভিযোগ।
আল জাজিরার নাবলুস প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম জানান, ‘এলাকায় ভ্রমণের’ অজুহাতে বসতি স্থাপনকারীরা তাল গ্রামে প্রবেশ করে। তার ভাষ্য, অতীতের ঘটনাগুলোর মতো এবারও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরাই উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় তারা অস্থায়ী ক্যারাভ্যান ও তাঁবু স্থাপন করে, যা পরে অবৈধ বসতিতে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের পর নাবলুস ও তালকে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে ইসরায়েলি বাহিনী। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পথও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তালমুখী সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়ায় জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার নাবলুস ঘিরে অন্তত পাঁচটি ফিলিস্তিনি গ্রামে বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম তীরের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি নাবলুস। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থনে সেখানে নিয়মিত হামলা ও হয়রানি চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের হাতে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৮৭ জনে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে ২১ জন বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, একই সময়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮৫০ ফিলিস্তিনি।
সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, এই ঘটনা চলমান ‘নাকবা’র আরেকটি প্রতিচ্ছবি এবং দখলদার কর্তৃপক্ষ, তাদের বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর সমন্বিত সহিংসতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইসরায়েলি নিহতদের ঘটনার জবাবে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি জানিয়েছেন, তাল এলাকার হামলার জন্য দায়ী বলে দাবি করা ফিলিস্তিনির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা, সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের কর্মপরমিট বাতিল, পশ্চিম তীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, নতুন চেকপয়েন্ট স্থাপন এবং নতুন কৃষিভিত্তিক আউটপোস্টের অনুমোদন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘পূর্ণ শক্তিতে’ অভিযান চালানোর অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ফিলিস্তিনি শহর ও আশপাশের এলাকায় ‘কঠোর হাতে’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বসতি স্থাপনকারীরাই ইসরায়েলের নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি এবং তাদের আরও শক্তিশালী করা হবে।
এদিকে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহু সরকারের কঠোর অবস্থান পশ্চিম তীরকে আরও বিস্ফোরণমুখী করে তুলছে। জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থান পরিবর্তনের প্রচেষ্টা এবং চলমান পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে আরও গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্র: আলজাজিরা