মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র কি খুলছে আরেকটি সামরিক ফ্রন্ট
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে
চলমান অস্থিরতার মধ্যে এবার নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে লোহিত
সাগর। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবগামী নৌবাণিজ্যে বাধা দেওয়ার
ঘোষণা দেওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র কি এবার আরেকটি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে?
হুথি
বিদ্রোহীরা সোমবার ঘোষণা দেয়, সৌদি আরবের বন্দরে পণ্য আনা-নেওয়া করা জাহাজগুলোকে
তারা আর নিরাপদে চলাচল করতে দেবে না। এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরবের তেল
রপ্তানি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব বিশ্ব
জ্বালানি বাজারেও পড়বে, কারণ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ এই রুটের ওপর
নির্ভরশীল।
লোহিত
সাগরের এই নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের প্রায়
১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিপুল
পরিমাণ তেলও এই রুট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
হুথিদের
ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এখন
পর্যন্ত সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটনের কাছে সামরিক সহায়তা চায়নি, তবুও
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে
কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
ট্রাম্প
বলেন, অতীতেও হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও তা
করা হবে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি
জটিল।
দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের ঝুঁকি
বর্তমান
ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক উত্তেজনার
পাশাপাশি হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি
ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা ভাগ করে ব্যবহার করতে হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য
ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেল
রয়টার্সকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজের
একটি অংশ ইয়েমেন উপকূলে সরিয়ে নিতে হতে পারে। একই সঙ্গে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও
ড্রোন হামলা মোকাবিলায় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ
বিশ্লেষকদের
মতে, হুথিদের নতুন পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের
বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক চাপ প্রয়োগ করে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে
আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে বিপুল পরিমাণ আকাশ
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোলাবারুদ প্রয়োজন হবে। এতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে
মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সাবেক
মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় বলেন, অতীতের ঘটনাগুলো প্রমাণ
করে হুথিদের লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বিঘ্ন
ঘটানোর সক্ষমতা রয়েছে।
আগের অভিযানেও পুরোপুরি দমন সম্ভব হয়নি
জো
বাইডেন প্রশাসনের সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথ নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র
হুথিদের বিভিন্ন অবস্থানে একাধিক বিমান হামলা চালায়। পরে ট্রাম্প প্রশাসনও ইয়েমেন
উপকূলে মার্কিন ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে অভিযান আরও জোরদার করে।
তবে
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ অভিযান চালিয়েও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি
ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বরং কয়েক মাসের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে বিমানবাহী রণতরী,
যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং বি-২ কৌশলগত বোমারু বিমান পর্যন্ত মোতায়েন করতে
হয়েছিল।
বর্তমানে
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান
অবস্থান করছে। ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে অতিরিক্ত সেনা ও সামরিক সরঞ্জামও
অঞ্চলটিতে পাঠানো হচ্ছে। ফলে ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে সামরিক
সম্পদের বণ্টন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে হুথিরাও চাপে পড়তে পারে
অন্যদিকে
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে হুথিদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ হবে না। সেন্টার
ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর সামরিক বিশ্লেষক ও
অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, ইরানের ওপর চলমান অবরোধের কারণে
হুথিদের কাছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তার
ভাষ্য, অবরোধ শতভাগ কার্যকর না হলেও তা হুথিদের সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য
প্রভাব ফেলছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই মাত্রার সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া তাদের
জন্য কঠিন হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স