নিউইয়র্কে স্পেন-জোয়ার, বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে উন্মাদনা
ক্রীড়া ডেস্ক:
বিশ্বকাপের ফাইনালকে ঘিরে নিউইয়র্কে স্পেনের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এখন তুঙ্গে। একসময় যেখানে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উপস্থিতিই ছিল বেশি চোখে পড়ার মতো, সেখানে এবার স্পেনের ধারাবাহিক সাফল্য পুরোনো সমর্থকদের পাশাপাশি নতুন এক সমর্থকগোষ্ঠীও গড়ে তুলেছে। ফলে ফাইনালের আগেই শহরের বিভিন্ন স্প্যানিশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ ও আড্ডাস্থলে লাল জার্সিধারীদের ভিড় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
ম্যানহাটনের চেলসি এলাকায় ১৫০ বছরের পুরোনো স্প্যানিশ বেনেভোলেন্ট সোসাইটি ‘লা নাসিওনাল’-এর পরিচালক রবার্ট সানফিজ জানান, ফাইনাল ম্যাচ দেখার আয়োজনের সব আসন আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে। শেষ মুহূর্তেও অসংখ্য ‘ভিআইপি’ অনুরোধ আসছে, কিন্তু নতুন করে কাউকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।
সানফিজ বলেন, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতার পর থেকেই সংগঠনটির কার্যক্রম নতুন প্রাণ ফিরে পায়। একসময়ের স্প্যানিশ অভিবাসীদের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এলাকাটিতে এখন আর আগের মতো স্প্যানিশদের বসতি নেই, তবু প্রবাসীদের কাছে লা নাসিওনাল এখনো আপন ঠিকানাই রয়ে গেছে।
২০১০ সালের ফাইনালের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেদিন এত মানুষ জড়ো হয়েছিল যে অনেকেই ভবনের বাইরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে খেলা দেখেছিলেন। তবে এবার ১৯ বছর বয়সী স্ট্রাইকার লামিন ইয়ামালের নেতৃত্বে স্পেনের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স এবং কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলগত কৌশল তাকে অনেকটাই নিশ্চিন্ত করেছে। তবু ম্যাচ চলাকালে নিজের উদ্বেগ সামলাতে তিনি দর্শকদের নিরাপত্তা দেখভাল করতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
ফাইনালের আগের দিন ম্যানহাটনের ‘মেরকাদো লিটল স্পেন’-এ লাল জার্সিতে ভরে ওঠে পরিবেশ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিকাগো থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী সমর্থক হাভিয়ের ভ্রিজ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন স্পেনকে সমর্থন করা মানেই ছিল হতাশা সঙ্গী করে চলা। কিন্তু এবার দলটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই দর্শন, একই কৌশল এবং নিজেদের স্বকীয় ফুটবল ধরে রেখে ধারাবাহিকভাবে জয় তুলে নিয়েছে।
তার ভাষায়, স্পেনের শক্তি কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বলের নিয়ন্ত্রণ, অবস্থানগত আধিপত্য এবং দলগত সমন্বয়ই তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, দলটি কখনোই নিজেদের ফুটবল দর্শন থেকে সরে যায়নি।
স্পেনের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্কে এমন অনেক নিরপেক্ষ সমর্থকও এখন লা রোজার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, যাদের প্রিয় দল আগেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার অনেক সমর্থকের কাছে আর্জেন্টিনার বিতর্কিত অভিযানের কারণে স্পেন এখন বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
ব্রঙ্কসের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী রোলান্ডো সানচেজ বলেন, তিনি শুরুতে মেক্সিকোর সমর্থক ছিলেন। কিন্তু দলটি শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তিনি স্পেনকে সমর্থন করছেন। তার মতে, লিওনেল মেসি ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হলেও স্পেনের তরুণ খেলোয়াড়েরাই ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
নিউইয়র্কের আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও স্পেনের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। এর পেছনে লামিন ইয়ামালের মরক্কান পারিবারিক শিকড় এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার স্প্যানিশ সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে পশ্চিম আফ্রিকান সম্প্রদায়ের মধ্যেও স্পেনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ইয়ামালের মায়ের জন্মভূমি ইকুয়েটোরিয়াল গিনি এবং উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসের পারিবারিক শিকড় ঘানায় হওয়ায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত সমর্থকদের সঙ্গে দলটির একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকান অভিবাসীদের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তি ও বৈধতার সুযোগ দেওয়ার স্পেনের নীতিও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ব্রঙ্কসভিত্তিক ফুটবল ক্লাব হান্টাজ এফসির কোচ এবং গাম্বিয়ার নাগরিক ওসমান সাহো বলেন, তার প্রথম পছন্দ ছিল সেনেগাল। তবে এখন তিনি চান স্পেনের এই তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্যের স্বাদ পাক। তার মতে, মেসি ইতোমধ্যেই সব বড় শিরোপা জিতেছেন এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আরেক কোচ, আইভরি কোস্টের মামাদু দিয়াবাতে বলেন, স্পেন এমন একটি দল, যারা বিশ্বের মানুষকে দলগত ফুটবলের সৌন্দর্য নতুন করে দেখিয়েছে। তার ভাষায়, স্পেনের খেলা শুধু জয়ের জন্য নয়, ফুটবলকে সুন্দরভাবে উপভোগ করারও এক অনন্য উদাহরণ।