সংবাদ শিরোনাম

সোমালিয়ার ইতিহাস বাঁচাতে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে

 প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

সোমালিয়ার ইতিহাস বাঁচাতে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে


আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ধুলোমাখা হাজারো রিল-টু-রিল টেপ। সারি সারি স্টিলের তাকজুড়ে সাজানো সেই টেপে বন্দী রয়েছে সোমালিয়ার কয়েক দশকের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংগীত, রাজনীতি এবং মানুষের কণ্ঠ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চৌম্বক টেপগুলোর মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগেই সেগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের জন্য এখন সময়ের বিরুদ্ধে ছুটছেন সোমালিয়ার রাষ্ট্রীয় বেতার কেন্দ্র রেডিও মোগাদিশুর একদল কর্মী।

১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকে সংরক্ষিত এসব রেকর্ডে রয়েছে সংবাদ বুলেটিন, রাষ্ট্রীয় ভাষণ, নাটক, গান এবং নানা ঐতিহাসিক সম্প্রচার। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ ঘণ্টার সম্প্রচার এখনও সংরক্ষিত আছে, যা সোমালিয়ার বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

রেডিও মোগাদিশুর আর্কাইভিস্ট আবদিকাদির গেদি রোবলে পুরোনো একটি টেপ মেশিনে রিল বসিয়ে সেটিকে কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। এরপর প্রতিটি টেপের শব্দ ডিজিটাল ফাইলে রূপান্তর করেন। একদিন একটি রিলে ভেসে ওঠে প্রখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ মুগে লিবানের প্রেমের গান। বহু বছর পর সেই কণ্ঠ শুনে নিজের যৌবনের স্মৃতিতে ফিরে যান তিনি।

রোবলের ভাষায়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোমালি ভাষার সংগীত, নাটক, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক রেকর্ডের ভাণ্ডার। কিন্তু এখনো সেগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাই শুধু সংরক্ষণ নয়, ভবিষ্যতে এই সংগ্রহ জনগণের জন্যও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতালীয় ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত রেডিও মোগাদিশু ধীরে ধীরে সোমালিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। শুরুতে সোমালি ও ইতালীয় ভাষায় সম্প্রচার হলেও পরে ইংরেজি, আরবি, সোয়াহিলি ও ওরোমোসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। একসময় তানজানিয়া, ইথিওপিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত এর সম্প্রচার পৌঁছে যেত। প্যান-আফ্রিকান চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই সম্প্রচারশৈলী অনেকের কাছে মিসরের রেডিও কায়রোর স্বর্ণযুগের কথা মনে করিয়ে দিত।

১৯৯০-এর দশকে গৃহযুদ্ধের সময় অল্প কিছু সময়ের জন্য এক যুদ্ধবাজ নেতার নিয়ন্ত্রণে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে রেডিও মোগাদিশু সোমালিয়ার প্রধান সংবাদমাধ্যম এবং জাতীয় স্মৃতির ভাণ্ডার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

চলতি বছরের জুনের শুরুতে সোমালিয়ার তথ্য মন্ত্রণালয় এবং পূর্ব আফ্রিকার ইউনেসকো আঞ্চলিক কার্যালয় যৌথভাবে মোগাদিশুতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আর্কাইভ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করে। লক্ষ্য, ভবিষ্যতে রেডিও মোগাদিশুর এই বিশাল সংগ্রহকে ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা।

প্রকল্পটির তত্ত্বাবধায়ক ইউনেসকোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গিলহার্মে কানেলা বলেন, এই জ্ঞানভাণ্ডার রক্ষা করা শুধু সোমালিয়ার জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এপ্রিল মাসে করা বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নে দেখা যায়, আর্কাইভে প্রায় ৪৫ হাজার টেপ ও রিল রয়েছে, যাতে প্রায় চার লাখ ঘণ্টার রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশের বেশি এখনো বাজানো সম্ভব। প্রায় ১০ শতাংশ বয়সের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পাঁচ শতাংশের বেশি টেপ সম্পূর্ণ নষ্ট বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

এই সংগ্রহের অনেক উপাদান বিশ্বের আর কোথাও নেই। ২০১৮ সালের একটি বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডে কিছু টেপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার ১৯৯২ সালে মোগাদিশুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ও সোমালি মিলিশিয়াদের সংঘর্ষের সময়ও কিছু মূল্যবান রেকর্ড হারিয়ে যায়।

গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে পুলিশ কর্মকর্তা আবশির হাশি আলি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর্কাইভ লুট হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। সরকারের পতনের পর যখন রাজধানীজুড়ে সংঘর্ষ চলছিল, তখনও তিনি এই ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষার জন্য ফিরে এসেছিলেন বলে জানান।

রেডিও মোগাদিশুর পরিচালক আবদি জেইতে বলেন, ডিজিটাল সংরক্ষণের কাজ ২০১২ সালেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু অর্থ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাজ এগোয়নি। এখন পর্যন্ত মোট সংগ্রহের মাত্র ১০ শতাংশ ডিজিটাল রূপ পেয়েছে।

তার ভাষায়, নতুন কিছু যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ পাওয়া গেলেও পুরো প্রকল্প শেষ করতে আরও বড় ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও সোমালিয়ার ইতিহাসবিদ ইমান মোহাম্মদ বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সোমালিয়ায় রেডিও মোগাদিশু ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম। মৌখিক ঐতিহ্যনির্ভর সমাজে রেডিওই ছিল এমন একটি মাধ্যম, যা দেশের মানুষকে একই জাতীয় পরিচয়ের বন্ধনে যুক্ত করেছিল।

যদিও পরবর্তী সময়ে বিবিসি সোমালি, রেডিও হারগেইসা এবং বিরোধী সম্প্রচারমাধ্যমগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তবু দীর্ঘ সময় শহুরে সোমালিয়ার শ্রুতিজগত নিয়ন্ত্রণ করেছে রেডিও মোগাদিশুই।

এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসংখ্য শিল্পী, কবি, নাট্যকার ও সম্প্রচারক জাতীয় পরিচিতি পেয়েছেন। অনেক সাংবাদিক পরে বিবিসি সোমালিতে সফল ক্যারিয়ার গড়লেও তাদের শুরু হয়েছিল রেডিও মোগাদিশু থেকেই।

সাবেক সাংবাদিক হাসান দাহির বলেন, একসময় দেশের কোটি মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল এই বেতার। যাযাবর পশুপালকরাও ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের খবর এখান থেকেই জানতে পারতেন।

১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মোহাম্মদ সিয়াদ বাররের শাসনামলে রেডিও মোগাদিশু রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। সংবাদ, নাটক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদ, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন এবং প্যান-আফ্রিকান চেতনা তুলে ধরা হতো সম্প্রচারে।

সেই সময় হালিমো খলিফ মাগুলের ‘ওহ আফ্রিকা, স্টিল অ্যাস্লিপ’ কিংবা মাহামুদ আবদুল্লাহি সাংগুবের ‘রিজেক্ট দ্য কালার অব ইম্পেরিয়ালিজম’-এর মতো রাজনৈতিক বার্তাসমৃদ্ধ গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে এসব গান নতুনভাবে পরিবেশিত বা ব্যবহার হলেও অনেক তরুণ এখন আর এর মূল শিল্পী কিংবা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানেন না।

সংবাদ পরিবেশনেও রেডিওটি আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, গিনি-বিসাউয়ের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মতো আন্তর্জাতিক বিষয়কে গুরুত্ব দিত।

সোমালিয়ার গণসাক্ষরতা অভিযানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রেডিও মোগাদিশু। ১৯৭২ সালে নতুন সোমালি লিপি চালুর পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার্থী পাঠিয়ে সাক্ষরতা কর্মসূচি পরিচালনা করে, আর সেই উদ্যোগকে সম্প্রচারের মাধ্যমে শক্তিশালী সমর্থন দেয় রাষ্ট্রীয় বেতার।

একসময় ইথিওপিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রেডিও মোগাদিশু ওরোমো ও সিদামা ভাষায়ও অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। সাবেক সাংবাদিক হাসান দাহিরের দাবি, ওই দুই ভাষায় এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম রেডিও সম্প্রচার, কারণ সে সময় ইথিওপিয়ায় আমহারিক ভাষার বাইরে অন্যান্য ভাষা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল।

তবে ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের একচেটিয়া অবস্থান ভেঙে যায়। ব্যক্তিমালিকানাধীন রেডিও, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় রেডিও মোগাদিশুর প্রভাব কমতে থাকে। বিদেশি ভাষার বেশির ভাগ সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়।

২০২১ সালের নভেম্বরে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের আত্মঘাতী হামলায় রেডিও মোগাদিশুর তৎকালীন পরিচালক আবদিয়াজিজ মাহমুদ গুলেদ নিহত হন।

ইতিহাসবিদ ইমান মোহাম্মদের মতে, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের কারণে সোমালিয়ার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হারিয়ে গেছে। ফলে গবেষকদের এখন বিদেশি আর্কাইভ কিংবা মৌখিক ইতিহাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের জন্য রেডিও মোগাদিশুর এই আর্কাইভ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যেই সংরক্ষিত আছে এমন এক সোমালিয়ার ইতিহাস, যা তারা কখনো নিজের চোখে দেখেনি।

সূত্র: আলাজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement