সংবাদ শিরোনাম

ক্রিমসন থ্রেডে শ্বাসরুদ্ধ পশ্চিম তীরের জনপদ

 প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:২৪ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ক্রিমসন থ্রেডে শ্বাসরুদ্ধ পশ্চিম তীরের জনপদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় ইসরায়েলের নির্মাণাধীন ‘ক্রিমসন থ্রেড’ সামরিক প্রতিবন্ধক স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকাকে দ্রুত সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, জর্ডান সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার ঠেকাতেই এই অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, প্রকল্পটির প্রকৃত উদ্দেশ্য তাদের কৃষিজমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করা।

আল জাজিরার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর জর্ডান উপত্যকার রাস আল-আহমার গ্রামের বাসিন্দা থায়ের বিশারাতের বাড়িতে পৌঁছাতে আগে প্রধান সড়ক থেকে ১০ মিনিটেরও কম সময় লাগত। এখন সব প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় চার চাকার গাড়িতে দুর্গম কাঁচা রাস্তা ঘুরে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। এলাকাজুড়ে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের টহল থাকায় স্বাভাবিক চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

থায়ের জানান, যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষিকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এলাকার পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। বহু সেচলাইন, কূপ ও গ্রিনহাউস ধ্বংস হওয়ায় উর্বর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। তার ভাষায়, "আমাদের চারদিকে ঘিরে শ্বাসরোধ করে রাখা হয়েছে।"

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঘোষিত ‘ক্রিমসন থ্রেড’ প্রকল্পের প্রথম ধাপে আইন শিবলি ও তায়াসির চেকপয়েন্টের মধ্যে প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সামরিক সড়ক ও গভীর পরিখা নির্মাণ করা হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি, এটি নিরাপত্তা জোরদারের অংশ। তবে এর অবস্থান জর্ডান সীমান্তের পরিবর্তে পশ্চিম তীরের অভ্যন্তরে হওয়ায় সমালোচকেরা বলছেন, প্রকল্পটি কার্যত ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি বিচ্ছিন্ন করার কৌশল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই প্রতিবন্ধকের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। এতে হাজার হাজার হেক্টর জমি ফিলিস্তিনিদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব পশ্চিম তীরের অন্য অংশে নির্মিত বিচ্ছিন্নতাবেষ্টনীর মতোই হতে পারে।

গত ৮ মার্চ ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার গিলাদ শ্রিকি কয়েকটি ফিলিস্তিনি গ্রাম পরিদর্শন করে বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে গত মাসে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট প্রকল্পটির নির্মাণ অব্যাহত রাখার অনুমোদন দিলে কাজ আরও দ্রুত এগোতে শুরু করে।

এরই মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পরিখা খনন করা হয়েছে। এতে কৃষিজমি, সেচব্যবস্থা, গ্রিনহাউস ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকেরা নিজেদের জমিতে যাওয়ার সুযোগও হারাচ্ছেন।

ইসরায়েলি বেসরকারি সংস্থা কেরেম নাভোতের গবেষক দ্রোর এতকেসের ভাষ্য, প্রকল্পটি একদিকে ফিলিস্তিনিদের পূর্বাঞ্চলের কৃষিজমিতে প্রবেশ সীমিত করছে, অন্যদিকে বিদ্যমান অবৈধ বসতিগুলোকে নতুন স্থাপিত আউটপোস্টের সঙ্গে যুক্ত করছে। তার মতে, সামরিক প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলেই জমি দখল করতে পারছে।

ফিলিস্তিনি কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ইসরায়েল ৪৯টি সামরিক ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি করেছে। ২০২৫ সালের পুরো বছরে এ ধরনের আদেশ ছিল ৪৭টি।

থায়ের বিশারাতের দাবি, নিরাপত্তার অজুহাতে ট্রাক্টর, পানির ট্যাংকসহ কৃষিকাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হচ্ছে। তার প্রশ্ন, "কৃষকের ট্রাক্টর আর পানির ট্যাংক কীভাবে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে?"

আল-মালেহ গ্রাম পরিষদের প্রধান মাহদি দারাগমেহ বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও ভয়ভীতির কারণে অন্তত ১৩০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তারা ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস হারিয়েছে। তার আশঙ্কা, পরিখা নির্মাণ শেষ হলে হাসপাতাল, স্কুল কিংবা জরুরি সেবাকেন্দ্রে পৌঁছানোও অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং পুরো এলাকাটি কার্যত একটি বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ১৪ জুলাই আল-বুকাইয়া এলাকায় তিনটি পানির কূপ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানকার পাম্প ও যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়। শুধু ওই দিনের ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ৪০ লাখ ইসরায়েলি শেকেল বা প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছে আতুফ গ্রাম পরিষদ।

পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় এখন একটি পানির ট্যাংক কিনতে থায়েরকে ৩০০ শেকেলের বেশি খরচ করতে হচ্ছে, যা আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তার দাবি, কৃষি উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে এবং চারণভূমিতে যেতে না পারায় বহু পরিবার তাদের অর্ধেক গবাদিপশু হারিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিলিস্তিনিরা এলাকা ছেড়ে গেলে সেখানে দ্রুত বসতি স্থাপনকারীরা প্রবেশ করে। আগে যেসব এলাকা 'সামরিক অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, পরে সেখানেই নতুন সড়ক, পানির সংযোগ ও বসতি গড়ে ওঠে।

থায়ের বিশারাতের কথায়, "আমরা মানবাধিকারও চাই না। অন্তত যেসব প্রাণীর অধিকারের কথা বলা হয়, সেই অধিকারটুকু যদি পেতাম, তাতেই বেঁচে থাকতে পারতাম।"

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement