সংবাদ শিরোনাম

নিউইয়র্কের ফিলিস্তিন পল্লীতে স্পেনের জয়ের প্রত্যাশায় উচ্ছ্বাস

 প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:১৬ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

নিউইয়র্কের ফিলিস্তিন পল্লীতে স্পেনের জয়ের প্রত্যাশায় উচ্ছ্বাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নিউইয়র্ক, ১৮ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের বে রিজ-যা ‘লিটল প্যালেস্টাইন’ নামে পরিচিত-সেখানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে উচ্ছ্বাস এখন তুঙ্গে। তবে আর্জেন্টিনা-স্পেন মহারণের আগে এলাকাটির বিপুলসংখ্যক আরব-আমেরিকান সমর্থকের বড় অংশের পছন্দ স্পেন। তাদের মতে, ফুটবলের আবেগের পাশাপাশি ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পেনের অবস্থানও এই সমর্থনের অন্যতম কারণ।

বে রিজের আরব-আমেরিকান ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ৭২ বছর বয়সী জেইন রিমাউই বলেন, ফুটবলকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না। নিজের কার্যালয়ে ফিলিস্তিনের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, যেসব দেশ ফিলিস্তিনসহ তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবির পাশে থাকে, তিনি সেসব দেশকেই সমর্থন করেন। তার ভাষায়, ২০২৪ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সমালোচনায় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ায় স্পেনের প্রতি তাদের স্বাভাবিকভাবেই আলাদা সমর্থন তৈরি হয়েছে।

বিশ্বকাপের ফাইনাল নিউইয়র্কের পাশের অঙ্গরাজ্য নিউ জার্সিতে হওয়ায় পুরো এলাকাজুড়েই ফুটবল উৎসবের আমেজ। ফিলিস্তিনি রেস্তোরাঁ, ইয়েমেনি ক্যাফে, লেবানিজ মুদি দোকান থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শোভা পাচ্ছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা। তবে এলাকার দেয়ালজুড়ে এখনও স্পষ্ট ফিলিস্তিনি পরিচয়ের নানা প্রতীক-গ্রাফিতি, কেফিয়াহ নকশা, তাতরিজ সূচিশিল্প ও তরমুজের প্রতীক।

আল রিফ বেকারির মালিক তালাল আবদরাবোহ বলেন, স্পেনের প্রতি এই সমর্থন কোনোভাবেই আর্জেন্টিনাবিরোধী নয়। বরং ফিলিস্তিন ইস্যুতে স্পেনের অবস্থান এবং আন্দালুসিয়ায় আরব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস স্পেনকে আরবদের কাছে বিশেষভাবে আপন করে তুলেছে। তার ভাষায়, প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, স্পেন খেললে তাদের সমর্থন স্পেনের দিকেই থাকবে।

বেকারিটির দেয়ালে জেরুজালেমের ডোম অব দ্য রকের বড় একটি চিত্র এবং ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি শোভা পাচ্ছে। আবদরাবোহ বলেন, বিশ্বকাপে আরব দলগুলোর প্রতিটি ম্যাচে পুরো কমিউনিটি একসঙ্গে মাঠের বাইরের লড়াইয়ে নেমেছিল। আরব দলগুলো খেললেই ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে সমর্থকেরা একসঙ্গে উল্লাস করেছেন।

এবারের বিশ্বকাপে রেকর্ড আটটি আরব দেশ অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে ফ্রান্সের কাছে বিদায় নেয়। অন্যদিকে, শেষ ষোলোতে ওঠা মিসর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তের পর ম্যাচ হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।

আল-আকসা বেকারির মালিক মাহমুদ কাসেম বিশ্বকাপজুড়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ আরব দলের ম্যাচের সময় দর্শকদের বিনা মূল্যে ফালাফেল বিতরণ করেন। তিনি বলেন, এটি ব্যবসার জন্য নয়; বরং ফিলিস্তিনের মতো একসঙ্গে খেলা দেখার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগ। তার মতে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, মরক্কান, জর্ডানিয়ানসহ বিভিন্ন আরব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা ছিল দেখার মতো।

কাসেমের আশা, প্রবাসী আরবদের এই ঐক্যের চিত্র একদিন আরব বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্বও অনুসরণ করবে। তিনি বলেন, নিউইয়র্ক নিকস এনবিএ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর যেমন পুরো শহর রাস্তায় নেমে উদ্‌যাপন করেছে, ঠিক তেমন পরিবেশ তৈরির জন্য তিনি পুলিশের আপত্তিও আলোচনার মাধ্যমে দূর করতে সক্ষম হন।

তার মতে, স্পেন শুধু ফিলিস্তিন নয়, লেবাননের ওপর হামলার ক্ষেত্রেও মানবিক অবস্থান নিয়েছে। এ কারণে এলাকাটির বহু মানুষ স্পেনের জয় দেখতে চান। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার বিপুল সমর্থক রয়েছে। পাশাপাশি স্পেনের বিভিন্ন ক্রীড়াবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। গত বছর স্পেনের ক্লাব অ্যাথলেটিক বিলবাও গাজায় গণহত্যা বন্ধের আহ্বানও জানায়।

তবে কাসেমের অভিযোগ, রাজনীতি থেকে ফুটবলকে দূরে রাখার কথা বলা হলেও ফিফাই খেলাটিকে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছে। তার দাবি, ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করা হলেও গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের পরও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার প্রতি কিছু আরব সমর্থকের আপত্তির কারণ দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে সরকারের ইসরায়েলপন্থী নীতি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে গ্যালারিতে ইসরায়েলের পতাকাও দেখা যায়। তবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল বা খেলোয়াড়েরা গাজা সংঘাত নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেননি। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের চাপের মুখে জেরুজালেমে ইসরায়েলের বিপক্ষে নির্ধারিত একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছিল আর্জেন্টিনা।

তবু অনেক আরব-আমেরিকান সমর্থক আর্জেন্টিনার পক্ষেও রয়েছেন। তাদের কাছে লিওনেল মেসির ফুটবল প্রতিভা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে। বে রিজের ২৪ বছর বয়সী নাপিত করিম বুজেরার ভাষায়, গ্যালারিতে কিছু ইসরায়েলি পতাকা দেখা গেলেই আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সেই পরিচয়ে বিচার করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখা মেসিকে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মনে করেন।

তার মতে, ফাইনালে যে দলই জিতুক, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল প্রবাসী আরবদের পারস্পরিক সংহতি। আগামী বিশ্বকাপে আরও বেশি আরব দেশ অংশ নিলে সেই ঐক্যের ছবি আরও বড় পরিসরে দেখা যাবে।

সূত্র: আলজাজিরা 

Advertisement
Advertisement
Advertisement