টানা সপ্তম রাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা অব্যাহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক;
টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। তবে তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে যুদ্ধাপরাধ করছে। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক সামরিক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন, হামলা অব্যাহত থাকলে দেশটি পূর্ণমাত্রার পাল্টা আক্রমণে যাবে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, বাংলাদেশ সময় রাত ১২টার দিকে শুরু হওয়া অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ সরবরাহ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকম জানায়, জাস্ক, সিরিক, বুশেহর, বন্দর আব্বাস, কেশম দ্বীপ, আহভাজ ও ইয়াজদে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, শনিবার ভোরে মধ্যাঞ্চলের ইয়াজদে অন্তত পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক শহরেও তিনটি বিস্ফোরণের কথা জানানো হয়। একই সময়ে মেহর নিউজ এজেন্সি জানায়, দক্ষিণের একাধিক প্রদেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
পরবর্তী সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হরমোজগান প্রদেশে হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। প্রদেশটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির উপকূলে অবস্থিত।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অঞ্চলটিতে অবস্থানরত বা ভ্রমণের পরিকল্পনাকারী নাগরিকদের নতুন করে সতর্ক করেছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা, সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা কর্নেল আব্বাস দাহুক আল জাজিরাকে বলেন, ইরান ও তাদের মিত্র হুথিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত করে, তবে তা হবে অত্যন্ত গুরুতর উত্তেজনা। এতে শুধু অঞ্চল নয়, আন্তর্জাতিক বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
অন্যদিকে তেহরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দক্ষিণাঞ্চলের সেতু, রেলপথসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে এসব স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখানো হয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হামলা বন্ধ না হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে, যা ভয়াবহ মানবিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
এরই মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলার দাবি করেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, শুক্রবার রাতে বাহরাইনে মার্কিন ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলা চালানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি নিশ্চিত করেনি।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটির বিমান হ্যাঙ্গার, পার্কিং এলাকা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং কয়েকটি যোগাযোগ সেতুতে হামলা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব স্থাপনা থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানের ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
একই সময়ে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চতুর্থবারের মতো বাহরাইনজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাসিন্দাদের শান্ত থাকার এবং নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
এর আগে শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও দুই থেকে তিন দিন হামলা চালালে ইরান প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার সীমা ছাড়িয়ে পূর্ণমাত্রার আক্রমণাত্মক অভিযানে যাবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে তিনি বলেন, ইরান আর শুধু 'যেমন কর্ম তেমন ফল' নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজনে কোনো রাজনৈতিক সীমারেখাকেই নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হবে না। তার দাবি, যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির মার্কিন কৌশল ব্যর্থ হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে ইরানের হামলার তীব্রতা আরও বাড়বে।
ইরানের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এরপর আইআরজিসি বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, জর্ডান ও সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করে।
শুক্রবার কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের হামলায় একটি বিদ্যুৎ ও পানি উৎপাদন কেন্দ্রের একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে আগুন লাগে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির নাগরিক ও বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের সুপেয় পানির বড় অংশই লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের মোট বিশুদ্ধকৃত লবণাক্ত পানির প্রায় ৪০ শতাংশ এসব দেশেই উৎপাদিত হয়। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সূত্র:আলজাজিরা