রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় দম্পতির মৃত্যুদণ্ড, দ্রুত বিচার সম্পন্নের দৃষ্টান্ত
স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় দুই আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেন। এছাড়া সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আদালত আরও নির্দেশ দেন, নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না করলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশু রামিসার ওপর সংঘটিত এই অপরাধ কেবল একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়; এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধ, শিশু নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর এমন নৃশংসতা পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে এবং ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন যৌন সহিংসতা বা হত্যার শিকার হয়, তখন তার প্রভাব শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পুরো সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আদালত জানায়, বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম অত্যন্ত স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হয়েছে।
বিচারক তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার মামলাগুলো একই ধরনের দ্রুততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর একটি বাসা থেকে বের হওয়ার পর দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার কৌশলে নিজের বাসায় নিয়ে যান। পরে শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে তার মা অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান। সন্দেহের একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা শোবার ঘরে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বালতির মধ্যে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান।
ঘটনার পরপরই পুলিশ স্বপ্নাকে আটক করে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনার পরদিন পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মাত্র চার দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। পরদিন সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়ে অধিকাংশ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের দিন নির্ধারণ করেন।
ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে রায় ঘোষণার মাধ্যমে মামলাটি দেশের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত নিষ্পত্তির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।