কেসিসির টেন্ডার সিন্ডিকেটে ভাঙনের ইঙ্গিত: প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে দুর্বল হচ্ছে পুরোনো প্রভাববলয়—এমন দাবি; পাল্টা তৎপরতার অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
মাসুদ আল হাসান, খুলনা
খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি টেন্ডার সিন্ডিকেটে ভাঙনের আভাস মিলেছে। বর্তমান প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোর ফলে দীর্ঘদিনের প্রভাববলয় দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও সূত্র। তবে অভিযোগ উঠেছে, এতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি চক্র প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু করেছে।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, কেসিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত সরকারের সময়ে কেসিসিকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সেই চক্রের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, কয়েকজন ঠিকাদার, স্বাধীন পেশাজীবীর পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তি এবং করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন ও ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অন্তত ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নথি তলব করে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য মিললেও সিন্ডিকেটের কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে যায়নি বলে দাবি তাদের।
তবে কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উন্নয়নকাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত, কাজের মান তদারকি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী চক্রটি চাপে পড়েছে বলে তাঁদের দাবি।
কেসিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই সিন্ডিকেট বহু বছর ধরে কৌশল বদলে সক্রিয় রয়েছে। অতীতে নিম্নমানের কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। এখন প্রশাসন স্বচ্ছতার বিষয়ে কঠোর হওয়ায় সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠী অস্বস্তিতে পড়েছে। করপোরেশনের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।”
কেসিসি সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি বিগত সরকার থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। শেখপাড়া এলাকার একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী এক ব্যক্তির আত্মীয় নগরের একটি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন টেন্ডারে সুবিধা নেওয়া হতো। তবে ওই ব্যক্তি নিজে সামনে না এসে অনুসারীদের ব্যবহার করতেন। একপর্যায়ে অনুসারীদের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁদের অভিযোগ, ঝুঁকি ও দায়ভার অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আর্থিক সুবিধা ভোগ করতেন মূল নিয়ন্ত্রক।
একজন অভিযোগকারী বলেন, “সব সময় নিজে আড়ালে থেকে অন্যদের সামনে রাখা হতো। এবার সেই কৌশল কাজে আসেনি। সামনে আরও অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আসবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব একাধিকবার করপোরেশন পর্যন্ত গড়িয়েছিল। পরে করপোরেশনের এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী মধ্যস্থতা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এদিকে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক একটি দীর্ঘমেয়াদি কমিটির উপকমিটিতে দায়িত্ব পালনকারী এক ব্যক্তির ভূমিকাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অতীতে চেম্বারকে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ওই ব্যক্তি আবারও বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।