টঙ্গী বাজারে সেপটিক ট্যাংক বিস্ফোরণে প্রাণ গেল কিশোর কারিগরের: উৎসবের আনন্দ বিষাদে রূপান্তর
টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি:
আসন্ন ঈদের আনন্দকে সামনে রেখে চারদিকে যখন প্রস্তুতি আর ব্যস্ততার ধুম, ঠিক তখনই গাজীপুরের টঙ্গী বাজারে নেমে এলো এক আকস্মিক ও স্তব্ধ করে দেওয়া দুঃখজনক ঘটনা । একটি জুয়েলারি কারখানার নিচে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস রূপ নিলো সাক্ষাৎ যমদূতে। মঙ্গলবার (২৭ মে) রাত সাড়ে ১০টার দিকে টঙ্গী বাজারের সালেহা মার্কেট ভবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সেপটিক ট্যাংক বিস্ফোরণে রুদ্র দত্ত নামের ১৫ বছরের এক কিশোরের করুণ মৃত্যু হয়েছে। নিহত রুদ্র ওই বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘রৌদ্র জুয়েলারি ওয়ার্কস’-এর মালিক গৌতম দত্তের ছেলে। বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সোনার নিখুঁত কারিগর হয়ে উঠছিল কিশোরটি, কিন্তু একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা তার সমস্ত স্বপ্নকে এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, টঙ্গী বাজারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সালেহা মার্কেট ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া নিয়ে শাখা, সিঁদুর বিক্রি এবং অলংকার তৈরির কাজ করতেন গৌতম দত্ত। তবে ভবনের নকশাগত ত্রুটির কারণে দোকানটির ঠিক নিচেই ছিল বহুতল ভবনটির বিশাল সেপটিক ট্যাংক। ঈদ ও আসন্ন উৎসবের মৌসুমকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই দোকানে কাজের প্রচণ্ড চাপ ছিল। অন্য কারিগরদের সাথে গভীর রাত পর্যন্ত রুদ্রও বাবার দোকানে বসে অলংকার তৈরির কাজ করছিল। ঘটনার রাতেও দোকানে জ্বলছিল কারিগরদের কাজের জন্য ব্যবহৃত আগুনের বার্নার। হঠাৎ করেই রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুরো বাজার এলাকা কাঁপিয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় দোকানের মেঝে মুহূর্তেই ধসে পড়ে এবং নিচ থেকে তীব্র বেগে আগুনের লেলিহান শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়া পুরো দোকানে ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কায় এবং আগুনের তাপে দোকানের ভেতরে থাকা রুদ্রর পুরো শরীর মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। আশপাশের ব্যবসায়ীরা জানান, বিকট শব্দের পর তারা চারদিকে ধোঁয়া এবং চিৎকার শুনতে পান। স্থানীয় লোকজন ও অন্যান্য দোকানদারেরা সাহসিকতার সাথে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে রুদ্রকে উদ্ধার করেন। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে প্রথমে দ্রুত টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তার শরীরের প্রায় সিংহভাগ দগ্ধ হওয়ার কথা জানিয়ে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। এরপর দ্রুত তাকে ঢাকার উত্তরার আইচি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে মাঝরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক রুদ্রকে মৃত ঘোষণা করেন। কিশোর ছেলের এমন আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যুতে পুরো পরিবারে এবং টঙ্গী বাজার এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, বহুতল ভবনের ওই সেপটিক ট্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করায় ভেতরে মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো অত্যন্ত দাহ্য ও বিষাক্ত গ্যাস জমা হয়েছিল। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা গ্যাস বের হওয়ার পথ না থাকায় পুরো ট্যাংকটি একটি জীবন্ত বোমায় পরিণত হয়েছিল। জুয়েলারি দোকানে কাজ করার সময় ব্যবহৃত আগুনের সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা তাপ কোনোভাবে ট্যাংকের গ্যাসের সংস্পর্শে আসাতেই এই ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনাটি নগরীর বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে সেপটিক ট্যাংক ব্যবস্থাপনার চরম উদাসীনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণশৈলীকে আবারও বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল আলামত সংগ্রহ করেছে। ভবনের মালিকপক্ষের কোনো অবহেলা বা নকশাগত ত্রুটি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। উৎসবের এই মৌসুমে একটি ফুটফুটে কিশোরের এমন মর্মান্তিক চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।