সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ফরিদপুরের ১০ গ্রামে ঈদ: বহু বছরের বিশ্বাসে ভিন্ন দিনের আনন্দ

 প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ফরিদপুরের ১০ গ্রামে ঈদ: বহু বছরের বিশ্বাসে ভিন্ন দিনের আনন্দ

অনলাইন ডেস্ক:

সারা দেশের মানুষ যখন ঈদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। জাতীয়ভাবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলেও, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে আজ বুধবার সকালেই ঈদের নামাজ আদায় করেছেন এই অঞ্চলের প্রায় ১০টি গ্রামের একাংশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। বর্ষীয়ান গ্রামবাসীদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রচলিত এক গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতির ধারাবাহিকতা।

ভৌগোলিক দূরত্বের সীমানা পেরিয়ে কেবল চান্দ্রনক্ষত্রের হিসাবকে কেন্দ্র করে এক দিন আগেই এই উৎসবের সূচনা ঘটে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাটাগড়, সহস্রাইল, দরিসহস্রাইল, মাইটকুমরা, রাখালতলি ও গঙ্গানন্দপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের একটি বড় অংশের মানুষ চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরীফের অনুসারী। এই দরবার শরীফের অনুসারীরা যুগ যুগ ধরে সৌদি আরবের সময় ও চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রোজা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও এই গ্রামগুলোতে ঈদের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে আজ বুধবার সকালের আলো ফোটার পরপরই।

সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে সহস্রাইল দায়রা শরীফ, রাখালতলি ও মাইটকুমরা মসজিদে মোট চারটি প্রধান জামায়াতে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের এই বিশেষ জামায়াতগুলোকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় মসজিদ প্রাঙ্গণগুলোতে। নতুন পোশাকে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাইকে দল বেঁধে ছুটে আসতে দেখা যায় আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতে। এবারের সহস্রাইল দায়রা শরীফের প্রধান জামায়াতে ইমামতি করেন ধলেরচর দরবার শরীফের পীর সাহেব মুফতি মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান। নামাজ শেষে মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং এরপরই শুরু হয় চিরাচরিত কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়। নামাজ শেষে মুসল্লিদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করে দায়রা শরীফের মসজিদ কমিটি, যা উৎসবের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তোলে।

এই অঞ্চলের ঈদ উদযাপনের ক্যানভাসটি কেবল বোয়ালমারীতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী আলফাডাঙ্গা উপজেলাতেও। আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও বোয়ালমারীর কাঁটাগড় গ্রামের বাসিন্দা মো. মাহিদুল হক জানান, চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরীফ ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এক দিন আগে রোজা ও ঈদ পালনের এই প্রথা এখানে বহু বছরের পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুসারীদের সংখ্যা খুব একটা না বাড়লেও, তাদের ধর্মীয় আবেগের গভীরতা বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি আরও জানান, বোয়ালমারীর স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আলফাডাঙ্গার ধলেরচর গ্রামের বেশ কিছু মুসল্লিও প্রতিবার এই জামায়াতে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন।

তবে উৎসবের এই আবহে কিছুটা স্মৃতিকাতরতাও রয়েছে। ধলেরচর গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কার জানান, অতীতে ধলেরচর মাদরাসা ঈদগাহ মাঠে তাদের নিজস্ব একটি বড় এবং আলাদা জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু সেই জামায়াতের ইমাম, প্রখ্যাত আলেম অধ্যক্ষ আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর সেখানে আর নতুন করে জামায়াত আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এখন ধলেরচরের মুসল্লিরা সকাল সকাল রওনা দিয়ে বোয়ালমারীর সহস্রাইল দায়রা শরীফে এসে ঈদের নামাজে শরিক হন।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিবেশীদের মতে, একই এলাকায় দুই দিনে ঈদ উদযাপিত হলেও তা কখনো সামাজিক সম্প্রীতিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না। সংখ্যায় কম হলেও নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রেখে তারা প্রতি বছর সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা দিনে এই উৎসব পালন করে আসছেন। একদিকে আজ বুধবার কতিপয় গ্রামে চলছে কোরবানি ও ঈদের আনন্দ, অন্যদিকে বাকি জেলাজুড়ে চলছে আগামীকালকের ঈদের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা আর প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে ফরিদপুরের এই অঞ্চলটিতে প্রতি বছরই এক অনন্য ও বৈচিত্র্যময় ঈদ সংস্কৃতির দেখা মেলে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement