গণভোটের গণরায়: উপেক্ষা করলে ঘনিয়ে আসবে চরম সংকট, সরকারকে পরওয়ারের হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম
বাংলার রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন টানটান উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট আর গণভোটের রায়কে ঘিরে রাজপথ ও সেমিনার কক্ষগুলো এখন তপ্ত যুক্তিতর্কে মুখর। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার বিকেলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ আলোকপাত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার বক্তৃতায় উঠে এসেছে হুশিয়ারি, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান এবং আগামীর সম্ভাব্য সংকটের পূর্বাভাস।
সেমিনারের শুরু থেকেই মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। ‘গণভোটের রায়: জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ’ শীর্ষক এই সভায় গোলাম পরওয়ার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সরকারকে সতর্ক করে বলেন, পাঁচ কোটি মানুষের দেওয়া এই রায় কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি জাতির চূড়ান্ত ইচ্ছার প্রতিফলন। এই রায়কে অস্বীকার করার অর্থ হলো আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা অতীতে জনগণের ভাষাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী পথ বেছে নিয়েছে, তাদের পরিণতি কী হয়েছে তা ইতিহাস স্বাক্ষী দিচ্ছে। তিনি বর্তমান সরকারকে সেই করুণ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য অনুরোধ জানান।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বিএনপির ভূমিকার ওপর কড়া সমালোচনা করেন। গোলাম পরওয়ার উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী এবং তার প্রতিনিধি সালাউদ্দিন সাহেব বারংবার ‘জুলাই সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে পালনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘গণভোটের রায়’ পালনে তাদের কণ্ঠে জড়তা দেখা যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাই সনদ নিয়ে কেন এই লুকোচুরি? জামায়াত নেতার অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদকে জনআকাঙ্ক্ষার আলোকে নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে বাস্তবায়ন করতে চায়। বিশেষ করে সনদের যে ১০টি বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ বা অসম্মতি দিয়েছে, সেগুলোকে তিনি সরাসরি ‘স্বৈরাচার উৎপাদনের হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেন। গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ইতিমধ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সেই বিতর্কিত নোটগুলোকে খারিজ করে দিয়েছে।
রাজনীতির মাঠকে ফুটবলের ময়দানের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, “বল এখন আর জামায়াতের কোর্টে নেই; বল এখন সরকারের কোর্টে। আপনারা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন, তবে সেই বল আপনাদের নিজেদের বারেই ঢুকে যাবে এবং গোল হজম করতে হবে।” তার এই রূপকধর্মী বক্তব্য উপস্থিত জনতাকে উদ্বেলিত করে তোলে।
চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী এবং সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনিরের উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে উঠে আসে গণভোটের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি। অন্যান্য বক্তারাও ঐক্যবদ্ধভাবে বলেন যে, জুলাই বিপ্লবের রক্তভেজা জমিনে দাঁড়িয়ে কোনো পক্ষকেই আর স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করতে দেওয়া হবে না।
সেমিনার শেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান এবং সরাসরি বিএনপি ও সরকারকে লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্য আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে। একদিকে জুলাই সনদের অঙ্গীকার, অন্যদিকে গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন—এই দুইয়ের দোলাচলে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শেষ পর্যন্ত সরকার জনগণের এই ‘সার্বভৌম অভিপ্রায়’ মেনে নিয়ে সংকট উত্তরণ করে, নাকি নতুন কোনো সংঘাতের পথে হাঁটে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।