মাথায় গিলু থাকলে পথ দেখান’: সরকারদলীয় বন্ধুদের সংবিধানে হাতেখড়ির পরামর্শ শিশির মনিরের

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পূর্বাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

মাথায় গিলু থাকলে পথ দেখান’: সরকারদলীয় বন্ধুদের সংবিধানে হাতেখড়ির পরামর্শ শিশির মনিরের
​নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম

​নগরের ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট হল রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। মঞ্চে প্রখর যুক্তির তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি যেন আজ কিছুটা সোজাসাপ্টাই হয়ে উঠলেন। সপ্রতিভ ভঙ্গিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের বিঁধে তিনি বললেন, "আমার কাছে মনে হয় সরকার দলীয় বন্ধুদের সংবিধান, সাংবিধানিক আইন ও সংস্কার বিষয়ে খুব বেশি একটা লেখাপড়া নাই। আল্লাহ আপনাদের আরও বেশি বেশি লেখাপড়া করার তৌফিক দান করুক।"
​রোববার বিকেলে ‘গণভোটের রায়: জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিশির মনির যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন হলভর্তি শ্রোতাদের মাঝে বয়ে যাচ্ছিল হাসির রোল আর করতালির জোয়ার। তবে হাসির ছলে তিনি যে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা কারোরই এড়ানোর সুযোগ ছিল না। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তিনি বলেন, আমরা যে সাংবিধানিক সমাধানের পথ দেখিয়েছি, তার বাইরে যদি আরও কোনো গ্রহণযোগ্য পথ আপনাদের জানা থাকে, তবে তা দেখান। কঠোর সুরে তিনি যোগ করেন, মাথায় যদি সামান্য গিলু থাকে তবে পথ দেখান! আমরা দেখতে চাই আপনাদের সমাধান।

​সেমিনারের মূল সুর ছিল ‘গণভোট’ এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ। অ্যাডভোকেট মনির অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে বলেন যে, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোট হলো জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপ। অথচ এই গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি দলের অবস্থান নেওয়া কেবল অকাম্যই নয়, বরং এটি দেশে বড় ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে। তিনি ইতিহাসের পাতা উল্টে মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৮৫, ১৯৯৬ কিংবা ১/১১—কোনো সংকটেই জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়নি। এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানও সেই একই সত্যকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাজ্য থেকে কলম্বিয়া কিংবা গ্রিস—বিশ্বের নজিরও যে একই কথা বলে, তা তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরেন।

​সেমিনারের গাম্ভীর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল মঞ্চে উপস্থিত দেশবরেণ্য রাজনীতিক ও আইনজ্ঞদের উপস্থিতি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। আলোচনার টেবিলে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ আরও অনেক হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব। প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনগণের সার্বভৌম অধিকার পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেন।

​আলোচনা শেষে হল থেকে বের হতে হতে এক দর্শক মন্তব্য করলেন, "শিশির মনির আজ শুধু আইন পড়াননি, বরং রাজনীতির ময়দানে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাটাও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।" সন্ধ্যার চট্টগ্রামের আকাশে তখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মেঘ জমছে, আর মানুষের কানে তখনো বাজছে সেই অমোঘ আহ্বান—জনগণের রায়কে সম্মান করতে শিখুন, নইলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না।
Advertisement
Advertisement
Advertisement