নিশুতি রাতে কেঁপে উঠল মাটি: সীমান্তের ওপারে কম্পন, আতঙ্কে নির্ঘুম চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকৃতির এক রহস্যময় আর চরম অনিশ্চিত আচরণের সাক্ষী হলো দক্ষিণ এশিয়া। যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জনপদ, ঠিক তখনই ভূ-গর্ভস্থ প্লেটের আকস্মিক নড়াচড়াতে কেঁপে উঠল ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র আর মানুষের হৃৎপিণ্ড। শনিবারের রেশ কাটতে না কাটতেই রোববার দিবাগত গভীর রাতে মিয়ানমারে আঘাত হানা এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই দুটি কম্পন দেশজুড়ে তৈরি করেছে এক অজানা শঙ্কা আর ভূ-তাত্ত্বিক দুশ্চিন্তা।
নিশুতি রাতের সেই আতঙ্ক
রোববার দিবাগত রাত তখন ১টা ৩৬ মিনিট। চারদিকে নিঝুম স্তব্ধতা। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক অদ্ভুত গর্জন আর দুলুনিতে ভেঙে যায় হাজারো মানুষের ঘুম। যারা জেগে ছিলেন, তারা দেখলেন সিলিং ফ্যান দুলছে, জানালার কাঁচ থরথর করে কাঁপছে। মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো হয়ে উঠল এক একটি খবরের কাগজ। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে এমন আকস্মিক ঝাকুনি তাদের মনে ১০ মে-র সেই ভয়াবহ স্মৃতির উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসের দেওয়া তথ্যমতে, রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৫.০। যদিও ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে, তবে এর তীব্রতা সীমান্ত পেরিয়ে অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, মিয়ানমারের সিদোকতায়া শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে এই আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ায় কম্পনটি বেশ ভালোভাবেই অনুভূত হয়েছে। বিশেষ করে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তবে গভীর রাত হওয়ায় এবং স্থায়িত্ব কম থাকায় বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
শনিবারের রেশ কাটেনি উত্তরবঙ্গে
মিয়ানমারের এই ভূ-কম্পনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই শনিবার (৯ মে) বিকেলে কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল। দিনটি ছিল অলস দুপুরের শেষ ভাগ। ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৩টা ১০ মিনিট। হঠাৎ করেই লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহের মাটি দুলতে শুরু করে। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪.৫। ভারতের আসামের বিলাসিপাড়া থেকে উদ্ভূত এই কম্পন উত্তরবঙ্গের মানুষের মনে বড় ধরনের ভীতি ছড়িয়ে দেয়।
আসামের সেই মাটির গভীর থেকে উঠে আসা শক্তির তরঙ্গ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে খুব বেশি সময় নেয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক সেকেন্ডের সেই কম্পনে ঘরবাড়ির আসবাবপত্র নড়তে শুরু করেছিল। গ্রামাঞ্চলে পুকুরের পানি দুলতে দেখে অনেকে দিগিবিদিক জ্ঞান হারিয়ে খোলা মাঠে আশ্রয় নেন। যদিও সে যাত্রায় কোনো হতাহত বা ভবন ধসের ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু পর পর দুই দিনের এই কম্পন যেন এক সতর্কবার্তা দিয়ে গেল।
ভূ-তাত্ত্বিকদের চোখে আগাম সংকেত?
ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ এবং এর আশপাশের অঞ্চলগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ভূ-তাত্ত্বিক ফাটল বা 'ফল্ট লাইনের' ওপর অবস্থিত। ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেটের সন্ধিস্থলে অবস্থিত এই অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরেই বড় কোনো ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চয় করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ছোট ছোট কম্পনের হার বৃদ্ধি পাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা দুইভাবে ব্যাখ্যা করছেন। একদল মনে করেন, ছোট ছোট কম্পনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ চাপ মুক্ত হচ্ছে, যা বড় দুর্যোগের ঝুঁকি কমায়। অন্যদলের মতে, এগুলি আসলে কোনো 'মেগা থ্রাস্ট' বা বিশাল ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত এই বলয়টি বর্তমানে বেশ অস্থির সময় পার করছে। শনিবার আসামের বিলাসিপাড়া এবং রোববার মিয়ানমারের সিদোকতায়ার ঘটনা দুটি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও ভূ-তাত্ত্বিকভাবে এরা একে অপরের সাথে সংযুক্ত। মাটির নিচের এই অস্থিরতা নির্দেশ করছে যে, প্রকৃতির বিশাল এক শক্তি আমাদের পায়ের নিচেই রূপান্তর ঘটাচ্ছে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
পর পর দুই দিনের এই ভূমিকম্প সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়নের এই যুগে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি। সরু গলি, গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ভবন আর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতির। ভূমিকম্পের সময় শান্ত থাকা, শক্ত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং লিফট ব্যবহার না করার মতো প্রাথমিক শিক্ষাগুলো এখন প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে 'বিল্ডিং কোড' কঠোরভাবে মেনে চলার বিকল্প নেই।
রোববারের সেই গভীর রাতের কম্পন যখন থিতিয়ে এল, তখন আকাশে হয়তো চাঁদের আলো ম্লান হয়ে আসছিল। কিন্তু সেই ক্ষণস্থায়ী দুলুনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল আমরা প্রকৃতির কতটা অসহায় সন্তান। উত্তরবঙ্গের সেই শান্ত বিকেল আর চট্টগ্রামের সেই নিঝুম রাত—দুটি ঘটনাই এখন জনমনে গভীর রেখাপাত করে আছে। বড় কোনো বিপর্যয় ঘটার আগে এই ছোট ছোট ঝাকুনিগুলো যেন আমাদের ঘুম ভাঙানোর ডাক। প্রকৃতি হয়তো বারবার সুযোগ দেয় না, তাই আগাম সতর্কতা আর সঠিক পরিকল্পনাই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের সুরক্ষা কবজ।
মাটির গভীরে কী চলছে তা মানুষের অসাধ্য হলেও, মাটির উপরে নিজেদের নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব। চব্বিশ ঘণ্টার এই আতঙ্ক যেন কেবল আতঙ্কেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা যেন আমাদের সচেতনতার নতুন পাঠ হয়ে দাঁড়ায়।