বন ছেড়ে লোকালয়ে মায়া হরিণ: ক্ষুধার তৃষ্ণা মিটল কুকুরের থাবায়
নিজস্ব প্রতিবেদক, কাপ্তাই
প্রকৃতির সবুজ চাদরে ঢাকা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের বনাঞ্চল। সেখান থেকে ভোরের কুয়াশাভেজা আলোয় লোকালয়ের দিকে পা বাড়িয়েছিল একটি মায়া হরিণ। হয়তো বনের গহীন কোণে খাদ্যের অভাব, কিংবা সামান্য একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সে বেরিয়ে এসেছিল তার চিরচেনা আবাস ছেড়ে। কিন্তু কাপ্তাই কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় পা রাখতেই নিয়তি তাকে দাঁড় করিয়ে দিল এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে। খাবারের সন্ধানে এসে প্রাণটাই বিলিয়ে দিতে হলো বন্য এই প্রাণীটিকে।
রবিবার (১০ মে) সকালে কাপ্তাইয়ের শান্ত জনপদে হঠাৎই ছন্দপতন ঘটে। স্থানীয়রা জানান, ভোরের দিকে পার্শ্ববর্তী গভীর জঙ্গল থেকে একটি মায়া হরিণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকার লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বন্য এই অতিথিকে দেখে এলাকাটি যখন সচকিত, ঠিক তখনই একদল ক্ষুধার্ত ও হিংস্র কুকুরের নজরে পড়ে সেটি। জীবন বাঁচাতে হরিণটি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল, বনের ক্ষিপ্রতা নিয়ে দৌড়েছিল এদিক-ওদিক। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কুকুরের দল চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আক্রমণ চালালে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিথর হয়ে পড়ে মায়া হরিণটি।
জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারি ইউনিয়ন (সিবিএ) কাপ্তাই শাখার সভাপতি বেলাল হোসেন সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "কুকুরগুলোর অস্বাভাবিক চিৎকার শুনে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, নিথর হয়ে পড়ে আছে সুন্দর এক মায়া হরিণ, আর কুকুরগুলো তাকে ঘিরে রয়েছে। মায়া হরিণটি বনের সৌন্দর্য, কিন্তু এভাবে লোকালয়ে এসে তার করুণ মৃত্যু হবে তা ভাবতেই খুব খারাপ লাগছে।"
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা সেখান থেকে হরিণটিকে উদ্ধার করে কর্ণফুলী রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে যান। বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল উদ্দিন অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে জানান, হরিণটি খাবারের সন্ধানেই লোকালয়ে এসেছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কুকুরের মারাত্মক আঘাতেই ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়।
এদিকে ঘটনার সংবাদ পেয়ে কাপ্তাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. এনামুল হক হাজারীর নির্দেশে ভেটেনারি সার্জন ডা. রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম কর্ণফুলী রেঞ্জে ছুটে যান। তারা মৃত হরিণটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ডা. এনামুল হক হাজারী জানান, হরিণটির শরীরে কুকুরের কামড় ও নখের গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে হরিণটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বনের কোলেই মাটিচাপা দেওয়া হয়।
কাপ্তাইয়ের এই ঘটনা বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের। বনের গভীরতা কমে আসা কিংবা খাদ্যের সংকটে বন্যপ্রাণীরা বারবার লোকালয়ে চলে আসছে, আর সেখানেই ওত পেতে থাকা বিপদ কেড়ে নিচ্ছে তাদের প্রাণ। এক চিলতে খাবারের খোঁজ করতে আসা সেই মায়া হরিণটি আজ ফিরে গেল মাটির নিচে, রেখে গেল বন্যপ্রাণী সুরক্ষার এক করুণ আর্তি।