বন্ধ ও আংশিক সচল বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
নিজস্ব প্রতিবেদক:
অর্থনীতির গতি সঞ্চার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বন্ধ ও আংশিক সচল বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ বৃহত্তর ৬০ হাজার কোটি টাকার সামগ্রিক প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নতুন জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী, এই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থায়ন গ্রহণ করতে পারবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। বর্তমান বাজারে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদহারে ঋণপ্রবাহের তুলনায় এ উদ্যোগ শিল্প ও সেবা খাতে অর্থায়নের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৩ মে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এই বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়, যার উদ্দেশ্য বন্ধ ও স্থবির শিল্প ইউনিট পুনরায় সচল করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
ঋণপ্রাপ্তির যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার
নীতিমালায় বলা হয়েছে, জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান, যাদের উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না—তারা এ সুবিধার আওতায় আসবে।
বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে—
- আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার উপযোগী ইউনিট
- রপ্তানিমুখী ও প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান
- দক্ষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অধিগৃহীত বা ইজারা নেয়া বন্ধ শিল্প ইউনিট
ঋণগ্রহীতাকে অবশ্যই ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) অনুযায়ী খেলাপিমুক্ত হতে হবে এবং অর্থপাচার, জাল-জালিয়াতি বা ঋণ অপব্যবহারের কোনো রেকর্ড থাকা যাবে না।
ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ ও ব্যবহার
একটি একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধন ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর, যা প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়নযোগ্য।
এ তহবিলের অর্থ ব্যবহার করা যাবে—
- শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধে
- বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য সেবা বিল পরিশোধে
- উৎপাদনের কাঁচামাল সংগ্রহে
শ্রমিকদের বেতন অবশ্যই ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে সরাসরি প্রদান করতে হবে; কোনো নগদ লেনদেন অনুমোদিত নয়। পূর্ববর্তী কোনো ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা থাকবে, পরবর্তী সময় থেকে কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।
তদারকি ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা
ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সাপ্তাহিক বিক্রয়/রাজস্ব প্রতিবেদন ব্যাংকে জমা
- প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংক কর্মকর্তাদের কারখানা পরিদর্শন
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেকোনো সময় সরেজমিন তদারকি
নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হবে এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে।
নীতিমালার উদ্দেশ্য
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো স্থবির শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নীতিমালার সফল বাস্তবায়নে অবদান রাখা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে