জলবায়ুর চরম রূপ: এল নিনোর দাপটে পুড়ছে দেশ, ধেয়ে আসছে খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মহাসংকট

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

জলবায়ুর চরম রূপ: এল নিনোর দাপটে পুড়ছে দেশ, ধেয়ে আসছে খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মহাসংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গ্রীষ্মের তীব্রতা পেরিয়ে বর্ষার যে স্নিগ্ধ রূপ চেনার কথা ছিল বাঙালির, ২০২৬ সালের এই জুন মাসে এসে তা যেন এক অচেনা রুদ্ররূপে আবির্ভূত হয়েছে। প্রকৃতিজুড়ে এখন এক চরম অস্থিরতা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) সাম্প্রতিক যৌথ পূর্বাভাস দেশের আকাশে এক মহা বিপর্যয়ের মেঘের বার্তা দিচ্ছে—তবে তা বৃষ্টির মেঘ নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক ও উত্তপ্ত সংকটের মেঘ। প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা জলবায়ুpattern 'এল নিনো'র আগ্রাসী প্রভাবে এবার বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষাকাল তার চেনা চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। বাতাসে আর্দ্রতার স্বাভাবিক জোগান ব্যাহত হওয়ায় মেঘের দেখা মিলছে কম, আর এর সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে এ দেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থার ওপর।

রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে এখন দিন কিংবা রাত—কোনো সময়েই মিলছে না স্বস্তি। থার্মোমিটারের পারদ ক্রমাগত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা ওপরে অবস্থান করছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে ভ্যাপসা গরম আর তীব্র তাপপ্রবাহ মিলে এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই মৌসুমে দেশে প্রায় ৮ থেকে ১০টি ছোট-বড় তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। অথচ এই সময়ে হওয়ার কথা ছিল মুষলধারে বৃষ্টি। প্রকৃতির এই উল্টো রথ যাত্রার কারণে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে দেশের বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি ও কৃষি খাত। মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম এবং অনিয়মিত হওয়ায় আমন চাষের প্রস্তুতি এবং বোরো-পরবর্তী ফসল চক্র এক মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বৃষ্টিহীন দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের মাঝে মাঝে হঠাৎ করে যে স্বল্পস্থায়ী ভারী বর্ষণ হচ্ছে, তা মাটির তৃষ্ণা মেটানোর বদলে উল্টো তৈরি করছে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা, যা স্থানীয় ফসল ও অবকাঠামোর ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই সংকটের গভীরতা কেবল স্থলের তাপমাত্রাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রধান জীবনরেখা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বা জিবিএম নদী ব্যবস্থাতেও। একদিকে বৃষ্টিপাতের অভাব, অন্যদিকে উজানে হিমবাহ গলনের মাত্রায় পরিবর্তন আসায় নদীর চেনা প্রবাহ দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে নদীগুলোর মিষ্টি পানির চাপ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি বা লবণাক্ততা তীব্র গতিতে দেশের ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের ফসলি জমি ও সুপেয় পানির উৎসগুলো ইতিমধ্যেই এই লবণাক্ততার আগ্রাসনে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এই বহুমুখী জলবায়ু পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের ওপরেও মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করছে; বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা হিট স্ট্রোক এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। দেশের এই রিয়েল-টাইম আবহাওয়া পরিস্থিতি ও সর্বশেষ সতর্কতা জানতে নাগরিকেরা বাংলাদেশ আবহাওয়া দপ্তরের ওয়েবসাইটে নজর রাখছেন এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বুঝতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সতর্কবার্তার দিকে চোখ রাখা হচ্ছে। উদ্ভূত এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রস্তুতি না নিলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement