জেলবন্দি জীবনের গল্প শোনালেন আইভী: মমতাজের গান ও ভাইয়ের স্মৃতির আবেগঘন মেলবন্ধন

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

জেলবন্দি জীবনের গল্প শোনালেন আইভী: মমতাজের গান ও ভাইয়ের স্মৃতির আবেগঘন মেলবন্ধন

প্রতিবেদক, ঢাকা:

দীর্ঘ এক বছর পর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্ত বাতাসে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। জামিনে মুক্ত হয়ে গত বুধবার মধ্যরাতে নিজ বাসভবনে ফেরার পর থেকেই তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক আবেগঘন পরিবেশ। রাজনীতি আর বন্দিজীবনের নানা টানাপোড়েনের মাঝেও জেলের ভেতরের এক অন্যরকম মানবিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গল্প শুনিয়েছেন সদ্য কারামুক্ত এই শীর্ষ জনপ্রতিনিধি। কারাপ্রকোষ্ঠে তার দিনগুলো কেমন কেটেছে, সেখানে অন্য বন্দিদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল—সেসব নিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠজন এবং শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি। আর এই স্মৃতিকথার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিলেন দেশের জনপ্রিয় ফোক সম্রাজ্ঞী ও মানিকগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম, যিনি নিজেও একই কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

কারাগারের সেই বন্দি জীবনে একাকীত্ব আর মানসিক চাপ দূর করতে প্রায়শই বসত গানের আসর। অবসরের সেই দিনগুলোতে কারান্তরীণ অন্য বন্দিদের গান গেয়ে শোনাতেন সংগীতশিল্পী মমতাজ। জেলখানার সেই ঘরোয়া আসরের প্রধান শিল্পীই ছিলেন তিনি। তবে সেই গানের আসরেও ছিল এক নীরব বেদনা ও কান্নার ইতিহাস। বৃহস্পতিবার দুপুরে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে তার স্কুলজীবনের দীর্ঘদিনের বন্ধুরা দেখা করতে এলে তিনি নিজেই প্রকাশ করেন সেই বন্দি জীবনের অজানা অধ্যায়। আইভী তার বন্ধুদের জানান, মমতাজ প্রায়শই তাকে গান গেয়ে শোনাতেন। কিন্তু মমতাজের ঝুলিতে থাকা অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে একটি বিশেষ গান গাইতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন তিনি। গানটি ছিল—‘আমার ভাইয়েরে কইও নাইওর আনতো গিয়া’।

এই গানটি গাইতে নিষেধ করার পেছনে লুকিয়ে ছিল আইভীর জীবনের এক চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডি। তিনি মমতাজকে অনুরোধ করেছিলেন, এই গানটি যেন তার সামনে না গাওয়া হয়। তবে সঙ্গে এও বলেছিলেন, যেদিন তিনি কারাগার থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্তি পাবেন, সেদিন মমতাজ চাইলে এই গানটি গাইতে পারেন। কারণ, ঘরে ফিরে পরিবারের সান্নিধ্যে গিয়ে তিনি তার মনের জমানো দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারবেন, কিন্তু চার দেয়ালের বন্দিদশায় এই গান শুনলে নিজেকে সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। আসলে এই গানের প্রতিটি লাইন আইভীর মনে করিয়ে দিত তার সদ্য প্রয়াত ছোট ভাই আহমদ আলী রেজা রিপনের কথা।

নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, গত বছরের ৭ এপ্রিল মাত্র ৫৫ বছর বয়সে আইভীর ছোট ভাই রিপন আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই, মাত্র এক মাসের মাথায় ৯ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসভবন থেকে পুলিশ আইভীকে গ্রেপ্তার করে। ফলে ভাইয়ের মৃত্যুর ক্ষত বুকে নিয়েই তাকে পাড়ি দিতে হয়েছিল কারাগারের পথে। কেবল ভাইয়ের মৃত্যুই নয়, এর চার বছর আগে রিপনের স্ত্রীও মারা যান। মা-বাবাহীন সেই এতিম তিনটি সন্তান তখন থেকেই আইভীর কাছেই বড় হচ্ছিল। ফলে নিজের বন্দিত্বের চেয়েও ওই সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও ভাইয়ের স্মৃতি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াত। কাকতালীয়ভাবে, আইভী যেদিন বিকেলে কারাগার থেকে মুক্তি পান, সেদিনও মুক্তির ঠিক আগমুহূর্তে মমতাজ ওই গানটিই গেয়েছিলেন। মমতাজ তখনও জানতেন না যে আইভীর মুক্তির আদেশ চলে এসেছে এবং তিনি কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।

বুধবার রাত সাড়ে ১২টায় যখন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী তার দেওভোগের বাড়িতে পৌঁছান, তখন থেকেই সেখানে এক উৎসবমুখর অথচ আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গভীর রাত থেকেই আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে একনজর দেখার জন্য ভিড় করতে থাকেন। অনবরত আসতে থাকে মুঠোফোনের কল। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এবং দীর্ঘদিনের চেনা মানুষদের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে হতে রাতের বাকি সময়টুকু আর চোখ বন্ধ করতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার দিনভরই তার বাড়িতে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।

দুপুরের দিকে তার রাজনৈতিক সতীর্থ ও সাবেক নারী কাউন্সিলর মিনুয়ারা বেগম, শাওন অংকন, সাদিয়া সাউদ এবং সাবেক কাউন্সিলর বীর মুক্তিযোদ্ধা অলিউর রহমানসহ অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে ছোট ভাই রিপনের কথা মনে পড়তেই আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি আইভী; উপস্থিত সবার সামনেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার এই কান্না উপস্থিত নেতাকর্মী ও বন্ধুদেরও চোখ সজল করে তোলে।

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর এই দীর্ঘ কারাবাসের নেপথ্যে ছিল গত বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণ। আন্দোলনকালীন সহিংসতা, হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক আইনের অধীনে তার বিরুদ্ধে মোট ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি মামলায় হাইকোর্ট তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিন স্থগিতের আবেদন জানালে গত ১৭ মে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন আদালত ‘নো অর্ডার’ প্রদান করেন। এর আগে ১০ মে অন্য ১০টি মামলায়ও হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। সব মামলার জামিন আদেশের নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই শেষে অবশেষে তিনি কারামুক্ত হন।

আইভী কেবল একজন সাবেক মেয়রই নন, তিনি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির এক অন্যতম দিকপাল। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১১ সালে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর টানা তিনটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ দুই দশক শহরটির নগরপিতার দায়িত্ব সামলেছেন।

এদিকে, সাবেক এই মেয়রের কারামুক্তির পর তার বাড়ির চারপাশের নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করেছে জেলা পুলিশ। তিনি বাসায় পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনের ল্যাম্পপোস্টে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপটি কেবল সাবেক মেয়রের বাড়িকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়নি; বরং সমগ্র নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার অংশ হিসেবে এই এলাকায় মোট চারটি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সাবেক মেয়রের সঙ্গে যে কেউ দেখা করতে আসতে পারলেও, তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সভা করছেন কিনা, সেটির ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি থাকবে এবং কোনো আইনি লঙ্ঘন দেখা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব মিলিয়ে, কারামুক্তির পর ভাইয়ের হারানোর বেদনা আর রাজনৈতিক কড়া নজরদারির মধ্যেই কাটছে এই জনপ্রিয় নারী নেত্রীর বর্তমান দিনগুলো।

Advertisement
Advertisement
Advertisement