আকাশে মেঘের আনাগোনা: তীব্র দহন শেষে স্বস্তির বৃষ্টির পূর্বাভাস
অনলাইন ডেস্ক:
সারা দেশজুড়ে বইছে তীব্র দাবদাহ। ভ্যাপসা গরমে ওষ্ঠাগত সাধারণ মানুষের জীবন। ঘর থেকে বের হলেই যেন আগুনের হল্কা এসে লাগছে গায়ে, আর ঘরের ভেতরেও নেই কোনো স্বস্তি। দিন আর রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান ঘুচে যাওয়ায় ২৪ ঘণ্টাই এক চরম অস্বস্তিকর পরিবেশের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সবাইকে। তীব্র গরমে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। তবে এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেই এক চিলতে স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলতে যাচ্ছে দেশজুড়ে, যা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনবে প্রকৃতির এই রুদ্র তাপমাত্রা।
বৃহস্পতিবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানান, আজ শুক্রবার থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এই বৃষ্টির হাত ধরেই চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের দাপট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৮টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে একসঙ্গে এত বিশাল এলাকাজুড়ে তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এটাই প্রথম, যা জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দেয়। সাধারণত মে মাসের শেষ সপ্তাহের দিকেই টেকনাফ উপকূল হয়ে বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা প্রবেশ করে। কিন্তু এবার মৌসুমি বায়ু আসতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় মে মাসের শেষ ও জুনের শুরুতে গরমের তীব্রতা এবং এর বিস্তৃতি এতটা প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষভাগে মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকাই স্বাভাবিক। তবে এবারের মূল সমস্যা কেবল তাপমাত্রা নয়, বরং বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর থেকে দক্ষিণ দিক দিয়ে আসা বাতাসে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প রয়েছে। এই জলীয় বাষ্প বাতাসে তাপকে ধরে রাখছে, যা এক ধরনের গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি করেছে। ফলে থার্মোমিটারে পারদ যতটুকু উঠছে, মানুষের শরীরে অনুভূত হচ্ছে তার চেয়েও কয়েক ডিগ্রি বেশি। একই সাথে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাচ্ছে না, যা মানুষের শারীরিক অস্বস্তি ও ক্লান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নগরের মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে রাতের তাপমাত্রা। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। উদাহরণস্বরূপ, গত রাতে রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সূর্য ডোবার পরও ইট-পাথরের এই নগরীতে স্বস্তির কোনো লক্ষণ মিলছে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিংবা ফ্যান চালিয়েও যেন স্বস্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী।
তবে আবহাওয়াবিদেরা আশার বাণী শুনিয়ে বলছেন, এই কষ্ট আর বেশি দিন স্থায়ী হবে না। আগামী ৭ থেকে ১০ জুনের মধ্যে মৌসুমি বায়ু পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। বর্ষার এই বাতাস পুরোপুরি সক্রিয় হলে সারা দেশেই তাপমাত্রা এক ধাক্কায় বেশ সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। এরই মধ্যে আজ শুক্রবার থেকেই রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো কোনো অঞ্চলে আবার মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণেরও আভাস দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রভাব প্রথমে দেখা যাবে। অর্থাৎ সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে তাপমাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করবে। তবে পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা কমতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে। কারণ সেই অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব পৌঁছাতে সাধারণত একটু সময় নেয়। তবুও প্রকৃতিজুড়ে যে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে, তাতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ থেকেই গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কেটে যাবে এবং প্রকৃতি ফিরে পাবে তার চিরচেনা সজল রূপ—এমনটাই প্রত্যাশা আবহাওয়া দপ্তরের।