বন্ধ সরকারি কারখানা সচল করতে 'রোড শো'র মহাপরিকল্পনা: বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন ছক

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

বন্ধ সরকারি কারখানা সচল করতে 'রোড শো'র মহাপরিকল্পনা: বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন ছক

অনলাইন ডেস্ক:

দেশের শিল্প খাতে গতি ফেরাতে এবং অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও লোকসানে থাকা সরকারি কারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশব্যাপী ব্যাপকভিত্তিক 'রোড শো' আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি লাভজনক ও টেকসই মডেলে রূপান্তর করাই এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য। নতুন এই উদ্যোগের প্রাথমিক প্রস্তুতি আগামী চলতি জুনের মধ্যেই সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বন্ধ কারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা’ সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শিল্প খাতের বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহল মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলো এভাবে বন্ধ বা লোকসানে ফেলে রাখা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা। আর তাই গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে আধুনিক ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন সরকারি কারখানার বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থা, বছরের পর বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকার নেপথ্য কারণ এবং সেগুলো নতুন করে চালুর সম্ভাব্যতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো সচল থাকলেও অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে লোকসান গুনছে, সেগুলোকে কীভাবে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই করা যায়, তা নিয়েও দীর্ঘ মতবিনিময় হয়। সরকারের এই প্রস্তাবিত রোড শো কর্মসূচির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সামনে বন্ধ ও অলাভজনক কারখানাগুলোর বিপুল সম্ভাবনা, বিদ্যমান বিশাল অবকাঠামোগত সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধাগুলো সরাসরি তুলে ধরা হবে। মূলত পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) বা যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এসব কলকারখানা পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি হাসান শিপলু বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, সভায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা তাদের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, আর্থিক দায়দেনা এবং কারখানাগুলো পুনরায় চালুর সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বা রিকভারি প্ল্যান উপস্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন যে, কেবল কাগজে-কলমে পরিকল্পনা করলেই হবে না, বরং বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। দেশের সম্পদকে অলস বসিয়ে না রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন।

সভাসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, কারখানাগুলোর সামগ্রিক পুনর্গঠন ও পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটির তৈরি করা সুপারিশগুলো বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের এই সুপারিশমালা চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে রোড শোর মূল রূপরেখা ও পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিনিয়োগের পর কোনো প্রতিষ্ঠান আইনি বা কারিগরি জটিলতায় না পড়ে।

গুরুত্বপূর্ণ এই নীতি-নির্ধারণী সভায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক ঝাঁক মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও আমলারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ শিল্প মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। উপস্থিত সকলে একমত পোষণ করেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বন্ধ কারখানাগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। সরকারের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ সফল হলে দেশের শিল্প খাতে যেমন নতুন জোয়ার আসবে, তেমনি হাজার হাজার বেকার যুবকের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement