অর্থনীতি সচলের বড় উদ্যোগ: বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা শিল্পে ২০ হাজার কোটির বিশেষ তহবিল

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:১১ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

অর্থনীতি সচলের বড় উদ্যোগ: বন্ধ ও ধুঁকতে থাকা শিল্পে ২০ হাজার কোটির বিশেষ তহবিল

বাণিজ্য ডেস্ক:

করোনা-পরবর্তী ধাক্কা, বৈশ্বিক মন্দা আর অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে দেশের অনেক শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সচল থাকলেও পর্যাপ্ত চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। থমকে যাওয়া এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে একটি বড় ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের মন্থর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়াতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রাক-অর্থায়ন স্কিম বা তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি)-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো যেসব বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ কিন্তু পুনরায় চালু হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান আংশিক সচল অথচ স্রেফ টাকার অভাবে ধুঁকছে, তারাও এই তহবিলের আওতায় ঋণ সুবিধা পাবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই তহবিল দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, ঠিক তখনই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতকে চাঙ্গা করার এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার ফলে রপ্তানিমুখী খাতগুলো আরও শক্তিশালী হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতিকে আরও সুসংহত করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশেষ তহবিলের ঋণের সুদের হার ও শর্তাবলী অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ব্যবসাবান্ধব করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংককে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে অর্থ দেবে। আর ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এই ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ বিতরণ করতে পারবে। উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে ঋণ বিতরণের পর প্রথম ছয় মাস কোনো কিস্তি দিতে হবে না, অর্থাৎ এই সময়ে গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা থাকবে। এই ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে দেশের রপ্তানিমুখী এবং প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া কোনো উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান যদি অন্য কোনো বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে কিংবা ভাড়া নিয়ে নতুন করে চালু করার উদ্যোগ নেয়, তবে তারাও এই তহবিলের অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পাবে।

তবে এই তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ কঠোর এবং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে কোনোভাবেই অর্থের অপব্যবহার না হয়। ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা, প্রকৃত ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের প্রয়োজনীয়তা, অতীতে বন্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্য সক্ষমতা বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো এই মূল্যায়নের জন্য নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সিআইবি বা ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত কোনো ঋণগ্রহীতা এই সুবিধার বাইরে থাকবেন। এছাড়া অতীতে অর্থপাচার, জালিয়াতি, ফান্ড ডাইভারসন বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই স্কিমের আওতায় কোনোভাবেই ঋণ সুবিধা পাবে না।

এই ঋণের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ মূলত শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া ও নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল মেটানো, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ, বিদেশি রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য প্রত্যক্ষ উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই এই অর্থ দিয়ে তাদের বিদ্যমান বা পুরোনো কোনো ঋণ সমন্বয় কিংবা পরিশোধ করতে পারবে না। অর্থাৎ, এই টাকা কেবলই কারখানার চাকা সচল করার কাজে ব্যয় করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ এই স্কিমের আওতায় এক সময়ে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ সুবিধা নিতে পারবে না। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর, তবে ব্যবসার যৌক্তিক প্রয়োজন ও সন্তোষজনক পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে এটি নবায়নের সুযোগ থাকবে। সামগ্রিকভাবে তিন বছর মেয়াদি এই আবর্তনযোগ্য বা রিভলভিং স্কিমটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩ সরাসরি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করবে। প্রাক-অর্থায়নের জন্য আবেদন করতে ব্যাংকগুলোকে ঋণ মঞ্জুরিপত্র, হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট, উৎপাদন সক্ষমতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট নামী বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র এবং গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট ঘোষণাপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। সব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অর্থ ছাড় করবে।

যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ স্কিমের কঠোর শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে অনুপযুক্ত বিবেচিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চাইলে নিজস্ব অর্থায়নে ও ঝুঁকিতে তাদের প্রচলিত নিয়মে ঋণ দিতে পারবে। তবে এই বিশেষ বিজ্ঞপ্তির আওতায় প্রদত্ত ঋণের আদায় ও তদারকির সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত থাকবে। গ্রাহক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ বা খেলাপি করা এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত গ্রাহকের বিক্রয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে এবং আকস্মিক কারখানা পরিদর্শন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে, স্কিমের আওতায় বিতরণ করা ঋণ যেকোনো সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল দ্বারা সরেজমিনে যাচাই করা হতে পারে। তদন্তে যদি ঋণের অপব্যবহার, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান বা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়ার প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে এই অপরাধের তথ্য সরকারের অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হবে। তবে শুধু কড়াকড়িই নয়, এই স্কিমের আওতায় দেশের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ অবদান রাখা সফল ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ী এবং দূরদর্শী ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার এক অনন্য ঘোষণাও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সৎ ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের আরও উৎসাহিত করবে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement