গানের সুর আর রণাঙ্গনের বীরত্বে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন পপসম্রাট আজম খান

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:০৮ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

গানের সুর আর রণাঙ্গনের বীরত্বে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন পপসম্রাট আজম খান

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলা গানের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন একজন মানুষের নাম সবার আগে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যিনি কেবল কণ্ঠ দিয়ে নয়, গিটারের প্রতিটি তারে এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন দ্রোহ, মুক্তি আর ভালোবাসার এক অনন্য নতুন ভাষা। তিনি আর কেউ নন, আমাদের পপসম্রাট আজম খান। আজ ৫ জুন, এই মহান সংগীতশিল্পীর প্রস্থান দিবস। ২০১১ সালের আজকের এই বিষাদময় দিনে তিনি চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে তাঁর চলে যাওয়ার দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ কিংবা ‘অনামিকা’র মতো কালজয়ী গানগুলোর মাঝে তিনি আজও এ দেশের কোটি শ্রোতার হৃদয়ে আগের মতোই সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে আছেন। তাঁর গানগুলো সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অদ্ভুত জাদুকরী শক্তি।

আজিমপুরের ১০ নম্বর কলোনিতে জন্ম নেওয়া আজম খানের শৈশব ও কৈশোরের সোনালী দিনগুলো কেটেছে আজিমপুর ও কমলাপুরের ধুলোবালি মাখা পথে। সেই একদম ছোটবেলাতেই তাঁর কোমল মনে গভীরভাবে দোলা দিয়েছিল ৫২-র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের চেতনা। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণজমায়েত আর ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো শুনতে শুনতেই বড় হয়েছেন তিনি। চারপাশের সেই অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সুর এবং গণমানুষের আবেগই তাঁকে পরবর্তী সময়ে সংগীতের এক অনিশ্চিত কিন্তু গৌরবময় পথে টেনে এনেছিল।

তবে আজম খানের পরিচয় কেবল একজন কিংবদন্তি গাইয়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন এই মাটির একজন অকুতোভয় সন্তান, যিনি দেশের প্রয়োজনে গান ছেড়ে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। একাত্তরের রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির একজন বীর যোদ্ধা। ২ নম্বর সেক্টরের সেকশন কমান্ডার হিসেবে তিনি ঢাকায় বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের কনকনে শীতে সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢাকায় প্রবেশের প্রাক্কালে মাদারটেকের ত্রিমোহনীতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দেশ স্বাধীনের পর যখন চারপাশ যুদ্ধবিধ্বস্ত, চারদিকে হাহাকার আর যুবসমাজের একটা বড় অংশ দিশেহারা ও দিগ্ভ্রান্ত, তখন তাদের বুকভরা হতাশা দূর করে সঠিক পথে ফেরাতে আজম খান বেছে নেন তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম—গানকে।

পশ্চিমা রকের দুর্দান্ত ও উন্মাতাল সুরের আদলে বাংলা গানে তিনি যুক্ত করেন সম্পূর্ণ নতুন এক ধারা, যা বাঙালি আগে কখনো শোনেনি। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ সে সময় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার তরুণদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরে, মাথায় ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে মঞ্চে যখন তিনি গাইতেন, তখন হাজার হাজার তরুণ একাত্ম হয়ে যেত তাঁর সুরের সাথে। পপসম্রাট আজম খান আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই সত্যি, তবে তাঁর সৃষ্টি, জীবনদর্শন ও কালজয়ী গানগুলো সমসাময়িকতার সব দেয়াল ভেঙে তাঁকে বাঙালির মননে বাঁচিয়ে রাখবে হাজার বছর।

এই মহান সংগীতসাধকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কাল ৬ জুন দুপুর সাড়ে ১২টায় একটি বিশেষ সেলিব্রেটি টকশো এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ট্রিবিউট টু গুরু আজম খান’ সম্প্রচারিত হবে। যেখানে অংশ নেবেন আজম খানের পরিবারের সদস্য এবং তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’-এর সহযোদ্ধারা। তাঁরা স্মৃতিচারণ করবেন এই মহান শিল্পীর জীবনের নানা অজানা অধ্যায় এবং নতুন করে তুলে ধরবেন কীভাবে একজন মানুষ গান আর দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন একটি স্বাধীন দেশের পপ সংগীতের অবিসংবাদিত জনক।

Advertisement
Advertisement
Advertisement