হিংসা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শতবর্ষে আরও প্রাসঙ্গিক নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’: দেশব্যাপী কর্মসূচির ডাক
অনলাইন ডেস্ক:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ সৃষ্টির এক শতাব্দী পূর্ণ হতে চলেছে। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কবির এই অমোঘ বাণীকে নতুন করে ছড়িয়ে দিতে দেশব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন, সভা-সমাবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের এই আবহে তাঁর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদসহ একাধিক সংগঠনের নেতারা গণমাধ্যমে একটি যৌথ বিবৃতি পাঠিয়েছেন। বিবৃতিতে চলতি বছর ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার’ বা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানের শতবর্ষ পূর্তির প্রতি সমগ্র দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
ইতিহাসের পাতা ও নজরুলের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে এই অবিনাশী গানের জন্ম হয়েছিল। ১৯২৬ সালে যখন বাংলাজুড়ে আত্মঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠেছিল, তখন ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও বিচলিত কবি নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে গানটি রচনা ও সুর করেন। ওই বছরের ২২ মে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক সম্মিলনীতে তিনি প্রথম গানটি পরিবেশন করেছিলেন। পরবর্তীতে গানটি ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সাড়া জাগায় এবং একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এর স্বরলিপিও প্রকাশিত হয়। গানটি রচনার ঠিক পরপরই কবি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি পরিবেশন করে তরুণদের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। সৃষ্টির পর থেকে গত এক শতাব্দী ধরে বাঙালি জাতির যেকোনো ক্রান্তিকালে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এই গান প্রেরণার মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংস্কৃতিক নেতারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সময়ে যখন ধর্মীয় আদর্শকে বিকৃত করে সমাজজুড়ে হিংসা, বিদ্বেষ ও পারস্পরিক ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে, তখন নজরুলের এই গান সমাজকে নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়। অন্যের ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে এই গান এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী হাতিয়ার। এই ঐতিহাসিক গানের সমসাময়িককালেই কবি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মন্দির ও মসজিদ’ রচনা করেছিলেন, যেখানে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছিলেন যে, যে মানুষ নিজের ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে সত্যিকার অর্থে চিনেছে, সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না। বর্তমানের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে কবির এই দর্শন ও বাণী এক পরম দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
এই যৌথ আহ্বানে দেশের প্রথম সারির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো একাত্মতা প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শীর্ষস্থানীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ নজরুলসংগীত সংস্থা, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা এবং বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ। এছাড়া দেশের আবৃত্তি অঙ্গনের প্রতিনিধিত্বশীল জোট বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি রক্ষা আন্দোলন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, সমগীত, সুর সপ্তক এবং নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সাংস্কৃতিক শক্তির পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, আনন্দধারা ও বসন্তবাহার সঙ্গীত একাডেমি এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে শিশুদের বৃহৎ সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরও এই উদ্যোগে শামিল হয়েছে। নেতৃবৃন্দ মনে করেন, নতুন প্রজন্মের ভেতর নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই গানের চর্চা ও এর পেছনের ইতিহাস তুলে ধরা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।