পদোন্নতিবঞ্চনার ক্ষোভ: এবার স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন সিআইডি প্রধানের

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৭:৪৭ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

পদোন্নতিবঞ্চনার ক্ষোভ: এবার স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন সিআইডি প্রধানের


অনলাইন ডেস্ক:

পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে ফের এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার জন্ম হলো। গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশের পাঁচজন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান আলি আকবর খান। সদ্য ঘোষিত পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায় নিজের নাম না দেখে চরম ক্ষোভ ও অভিমান থেকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে আগামী মাসের ২ জুলাই থেকে পিআরএল (প্রি-রিটায়ারমেন্ট লিভ) বা অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন সিআইডির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

পুলিশের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, ডিআইজি আলি আকবর খানকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে সিআইডির পূর্ণাঙ্গ প্রধান করার একটি প্রস্তাব প্রশাসনিক পর্যায় থেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে তার নাম বাদ পড়ায় খোদ পুলিশ সদর দপ্তর এবং সিআইডির অভ্যন্তরে নানা গুঞ্জন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে নানা ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আসা এই কর্মকর্তার এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে এখন প্রশাসনের অন্দরে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে তার এই পিআরএল আবেদনটি সরকার শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেছে কি না কিংবা তিনি আসলেই দায়িত্ব ছাড়ছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি।

আলি আকবর খানের এই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৬ বছরের এক বঞ্চনার ইতিহাস। তার স্বাক্ষরিত আবেদনপত্রটির বয়ান থেকে জানা যায়, বিগত ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের সময়, অর্থাৎ ২০০৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম সদস্য হিসেবে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করা হয়। দীর্ঘ এক যুগ ওএসডি থাকার পর ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর রাষ্ট্রীয় সেবার বাইরে বাধ্য হয়ে থাকার পর, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। এরপর গত ১ জুন তাকে সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধানের গুরুদায়িত্ব দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। মাত্র তিন দিনের মাথায় পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনে নিজের নাম না দেখে তিনি নিজেকে চরমভাবে উপেক্ষিত মনে করছেন।

আবেদনে আলি আকবর খান অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের কারণেই তিনি আবারও চাকরিতে ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন, যার জন্য তিনি নিহত ও আহত ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন। ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর চাকরিতে যোগদানের পর থেকে সর্বদা সততা, দক্ষতা ও সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের দাবি করে তিনি বলেন, ৪ জুনের পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনে তার নাম না থাকাটা তাকে ইঙ্গিত করে যে কোনো জানা-অজানা অযোগ্যতার কারণে তিনি আবারও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাই নিজের অযোগ্যতা নিয়ে সরকারের বোঝা না হয়ে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ২ জুলাই ২০২৬ থেকে তিনি এই অবসর কার্যকর এবং এক বছরের পিআরএল মঞ্জুরের অনুরোধ জানিয়েছেন।

এদিকে সিআইডি প্রধানের এই আবেদনটি ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (প্রশাসন) এ এ এম হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আলি আকবর খানের স্বেচ্ছায় অবসর এবং আগামী ২ জুলাই থেকে এক বছরের পিআরএল মঞ্জুরের আবেদনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন শীর্ষ কর্মকর্তার এমন বিদায় আবেদন পুলিশ বিভাগের পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়ার ভেতরের ক্ষোভ ও অসন্তোষকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।

Advertisement
Advertisement
Advertisement