চিকিৎসা খাতে নতুন দিগন্ত: ঢামেকে সফল কিডনি প্রতিস্থাপন, পরিদর্শনে ডা. রফিকুল ইসলাম

 প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

চিকিৎসা খাতে নতুন দিগন্ত: ঢামেকে সফল কিডনি প্রতিস্থাপন, পরিদর্শনে ডা. রফিকুল ইসলাম

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। সরকারি এই শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে সম্প্রতি অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে একটি জটিল কিডনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া। যুগান্তকারী এই চিকিৎসা সাফল্য কেবল ঢামেক হাসপাতালের সক্ষমতাকেই প্রমাণ করে না, বরং দেশের লাখ লাখ কিডনি রোগীর মনে নতুন করে বেঁচে থাকার আশার আলো সঞ্চার করেছে। ঐতিহাসিক এই অর্জনকে সাধুবাদ জানাতে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের উৎসাহিত করতে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ও দেশের বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।

তার এই পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ডা. রফিকুল ইসলাম হাসপাতালে পৌঁছালে তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানানো হয়। পরিদর্শনকালে তার সাথে উপস্থিত ছিলেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রধান, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তিনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত চিকিৎসক দলের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন এবং অস্ত্রোপচারের খুঁটিনাটি ও রোগীর বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। চিকিৎসকদের এই নিরলস পরিশ্রম ও সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি একে দেশের চিকিৎসা খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।

পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশে ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা ‘মৃত’ ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট হলো এমন একটি আধুনিক ও মানবিক প্রক্রিয়া, যেখানে ‘ব্রেন-ডেড’ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মৃত বলে ঘোষিত ব্যক্তির শরীর থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অঙ্গ সংগ্রহ করে অন্য এক বা একাধিক মুমূর্ষু রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। মানুষের হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও কর্নিয়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জীবনদায়ী অঙ্গগুলো এভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। জীবিত কোনো মানুষের শরীর থেকে অনেক সময় কিছু অঙ্গ নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয় না, আর এখানেই ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের অনন্য গুরুত্ব লুকিয়ে আছে।

বাংলাদেশে ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের অতীত ইতিহাস টেনে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশে আইনগতভাবে এই ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনো খুবই সীমিত। ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্যাডাভারিক কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। সে সময় একজন ব্রেন-ডেড রোগীর শরীর থেকে নেওয়া দুটি কিডনি দুজন গুরুতর অসুস্থ রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করে তাদের নতুন জীবন দেওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এত দিনেও এই মহতী উদ্যোগটি দেশে একটি নিয়মিত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রোগ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

দেশে ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের এই শ্লথ গতির পেছনে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ ও অন্তরায় চিহ্নিত করেন এই খ্যাতনামা ইউরোলজিস্ট। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সমাজে প্রচলিত নানা সামাজিক ও ধর্মীয় ভুল ধারণা, সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতার চরম অভাব এবং অঙ্গদানের প্রতি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভয় কাজ করে। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোর সীমিত অবকাঠামো, আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতা এবং জাতীয় স্তরে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই মূলত এই জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রমটি কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।

তবে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এই অচলাবস্থা চিরতরে কেটে যাবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডা. রফিকুল ইসলাম। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, ‘মানব অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এই নতুন আইনি কাঠামোতে কঠোর নৈতিক সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনি ও সামাজিক বাধাগুলো দূর করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।

তিনি দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নতুন এই আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে যদি ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা আবেগীয় দাতা এবং একটি সুসংগঠিত ‘জাতীয় সোয়াপ রেজিস্ট্রি’ চালু করা সম্ভব হয়, তবে প্রতি বছর হাজার হাজার অকাল মৃত্যুকে ঠেকানো সম্ভব হবে। আধুনিক এই আইনি কাঠামো এবং ঢামেক হাসপাতালের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে সফল প্রতিস্থাপনের এই ধারাবাহিকতা যদি নিয়মিত বজায় রাখা যায়, তবে বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিস্থাপন কার্যক্রম খুব দ্রুতই বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছাবে। এর ফলে শেষ পর্যায়ের অঙ্গ বিকলতায় ভোগা দেশের লাখ লাখ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে, যা বাংলাদেশকে চিকিৎসা পর্যটনের এক নতুন কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement