চার দশক পর জাতিসংঘের নেতৃত্বে বাংলাদেশ: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন খলিলুর রহমান

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

চার দশক পর জাতিসংঘের নেতৃত্বে বাংলাদেশ: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন খলিলুর রহমান

​বিশেষ প্রতিবেদক:

​বৈশ্বিক কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হলো। চার দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা ও কূটনৈতিক সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

​নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল ১০টায় অত্যন্ত উত্তেজনাকর এক ভোটের লড়াই শুরু হয়। বিশ্ব সংস্থাটির কার্যবিধির ৩০ নং ধারা অনুযায়ী আয়োজিত এই নির্বাচনে মোট ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্র তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান ৯৯টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে, তার একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের অভিজ্ঞ কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস লাভ করেন ৯১টি ভোট। মাত্র ৮ ভোটের ব্যবধানে সাইপ্রাসকে পরাজিত করে বিশ্বরাজনীতির এই শীর্ষ মর্যাদাপূর্ণ পদটি ছিনিয়ে আনে বাংলাদেশ।

​জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন নীতি অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব পাওয়ার কথা ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের। এই সুযোগেই এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনপুষ্ট সাইপ্রাস প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়। সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চার দশকেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। ফলে নির্বাচনটিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিই আস্থা প্রকাশ করে বিশ্বের সিংহভাগ রাষ্ট্র।

​ঐতিহাসিক এই বিজয় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশ এই মর্যাদাপূর্ণ পদটি লাভ করেছিল, যখন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ পুনরায় বিশ্বসভার এই শীর্ষ আসনে আসীন হওয়ার গৌরব অর্জন করল।

​জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি প্রতি বছর পরিবর্তিত হয় এবং জাতিসংঘের পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর (আফ্রিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক, পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান, এবং পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য) মধ্যে আবর্তিত হয়। সাধারণ পরিষদে কোনো পরাশক্তি বা ভেটো ক্ষমতার প্রভাব থাকে না, বরং প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র একটি করে গোপন ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়। ফলে এই নির্বাচনকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

​গত বছরের ২ জুন জার্মানির প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবক সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি এমন এক কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন যখন বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিবের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক জটিলতা বিরাজ করছিল। ঠিক তেমনি এক সংকটময় প্রেক্ষাপটেই ড. খলিলুর রহমানের কাঁধে আসতে চলেছে বিশ্ব পরিচালনার এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

​আগামী ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশনের সবচেয়ে আকর্ষক অংশ, উচ্চ-পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে ২২ সেপ্টেম্বর। জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধবিগ্রহ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের এই উত্তাল সময়ে বাংলাদেশের এই নেতৃত্ব বিশ্বমঞ্চে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় এক নতুন আশার আলো ছড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement