রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ওয়াশিংটনের জোরালো ভূমিকা চান স্পিকার: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্তের উন্মোচন
অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ওয়াশিংটনের সরাসরি ও জোরালো ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার সংসদ ভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এই জোরালো প্রস্তাব উত্থাপন করেন। নবনির্বাচিত স্পিকার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় সাক্ষাতের শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এরপর অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়, ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের মূল আলোকপাত ছিল বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট। স্পিকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে সৃষ্ট মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের সামগ্রিক সারসংক্ষেপ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সামনে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশাল এই জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং স্থানীয় নিরাপত্তার ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। এই মানবিক সংকটের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করতে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত গভীর মনোযোগের সাথে স্পিকারের বক্তব্য শোনেন এবং এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রয়াসের ওপর জোর দেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় থেকেই বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যকার সম্পর্কের মজবুত ভিত্তি সূচিত হয়েছিল। সংকটের সেই দিনগুলোতে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাড ওয়াশিংটনের নীতিকে উপেক্ষা করে যেভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিয়েছিলেন, তা আজীবন এদেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও আমেরিকার সরকার ও জনগণের মধ্যকার বন্ধন এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে স্পিকার রাষ্ট্রদূতকে জানান, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিফলন। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ কেবল কার্যকর গণতন্ত্র ও সুশাসনের মাধ্যমেই তার প্রকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। উভয় পক্ষই মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করবে বলে মত প্রকাশ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি, দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তথা ‘পিপল-টু-পিপল’ সম্পর্ক স্থাপন এবং সংসদীয় ককাস ফোরামে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উদযাপনের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের সমসাময়িক কিছু জরুরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কামনা করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার এবং পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে মার্কিন সরকারের কারিগরি ও আইনি সহায়তার অনুরোধ জানান স্পিকার। একই সাথে, দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিরসন এবং এর ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ লাঘব করতে বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে মার্কিন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের এই উন্নয়নযাত্রায় এবং সংকট উত্তরণে পাশে থাকার ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেন। অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদলের সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।