মায়ের নামে প্রতিষ্ঠান চান না প্রধানমন্ত্রী, দিলেন ব্যতিক্রমী অনুশাসন

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৯:২২ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

মায়ের নামে প্রতিষ্ঠান চান না প্রধানমন্ত্রী, দিলেন ব্যতিক্রমী অনুশাসন

প্রতিবেদক,ঢাকা :

​রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রদবদলের পর বিদায়ী সরকারের নামফলক মুছে নিজেদের নেতাদের নামে সব ধুয়ে মুছে নতুন করার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সেখানে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে করার একটি সরকারি প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। মায়ের নামে নামকরণের এই প্রস্তাব অনুমোদন না করে উল্টো প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি তাঁর মায়ের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান করতেই হয়, তবে বিদ্যমান কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম না বদলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

​জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুরে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ঈদুল আজহার আগে এই কেন্দ্রটির নাম পরিবর্তন করে 'সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠায়। কিন্তু আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই ফাইলে সই করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফাইলটি ফেরত পাঠান।

​প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের নোটে একটি বিশেষ অনুশাসন দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, পুরনো বা চলমান কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের ধারা তিনি সমর্থন করেন না। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা বা তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে যদি কোনো নতুন নামকরণ করতে হয়, তবে সম্পূর্ণ নতুন অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তা করতে হবে। প্রশাসনের অন্দরমহল এবং দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে বাংলাদেশের প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির চেনা ধারার বিপরীতে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সরকারের এই অবস্থান প্রশংসা কুড়াচ্ছে, কারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই নাম পরিবর্তনের যে হিড়িক পড়ে, তাতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি জনমনেও এক ধরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

​জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর ও বাস্তবমুখী অবস্থান এবারই প্রথম নয়। এর মাত্র একদিন আগেই প্রশাসনের এক অদ্ভুত বিদেশ সফরের আবদার ফিরিয়ে দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তার মশা নিধনের তথাকথিত ‘উদ্ভাবনী কার্যক্রম’ দেখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার একটি প্রস্তাব জমা পড়েছিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। সরকারি অর্থ খরচ করে মশা মারার বিদ্যা শিখতে আমেরিকা যাওয়ার এই প্রমোদভ্রমণের প্রস্তাবটি দেখামাত্রই নাকচ করে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

​প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে গতকাল সোমবার এই বিষয়ে জানানো হয় যে, মশা নিধন শেখা বা দেখার জন্য বিপুল অর্থ খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত রসবোধ ও কড়া বার্তার মিশ্রণে তাঁর অভিমতে লিখেছেন, মশা মারার কৌশল রপ্ত করতে সাতসমুদ্র পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করলে মশা নিধনের এর চেয়েও ভালো উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব।

​টানা দুই দিনে প্রধানমন্ত্রীর এমন দুটি সিদ্ধান্ত দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় এক নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে যেমন বিগত দিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর ও বিলাসী খামখেয়ালিপনায় লাগাম টানার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই ধরনের কঠোর ও দূরদর্শী অনুশাসন আগামী দিনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement