জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও সবুজ জ্বালানিতে ঢাকা-ইইউ একাত্ম: অর্থায়ন সহজ করার তাগিদ

 প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও সবুজ জ্বালানিতে ঢাকা-ইইউ একাত্ম: অর্থায়ন সহজ করার তাগিদ

মহানগর ডেস্ক:

​বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাত যখন নিত্যদিনের বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ ও পরিবেশ সুরক্ষায় এক টেবিলে বসল বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রাজধানী ঢাকার সচিবালয়ে মঙ্গলবার এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সবুজ জ্বালানি রূপান্তর এবং পরিবেশ সংরক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে উভয় পক্ষ। দেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। আধুনিক সাংবাদিকতার ধারায় এই আলোচনা কেবল দুটি পক্ষের আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না, বরং এটি ছিল জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে উন্নয়নশীল দেশের কণ্ঠস্বর এবং উন্নত বিশ্বের দায়বদ্ধতার এক মেলবন্ধন।

​সচিবালয়ে পরিবেশমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে টেবিলের মূল আলোচনায় স্থান পায় গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, কার্বন ক্রেডিট, সার্কুলার ইকোনোমি এবং আসন্ন কোপ৩১ সম্মেলন সংক্রান্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। আলোচনার শুরুতেই পরিবেশমন্ত্রী উন্নয়নশীল দেশগুলোর বঞ্চনার চিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সবচেয়ে কম ভূমিকা রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে তারাই সবচেয়ে বেশি জীবন ও জীবিকার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক অন্যায় ও অসমতা দূর করতে তিনি উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবশ্যই সহজ শর্তে এবং কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই সময়োপযোগী জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

​বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কেবল দাবির মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে গৃহীত বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্যোগের চিত্রও ইইউ প্রতিনিধির সামনে তুলে ধরা হয়। মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান যে, বর্তমান সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দেশব্যাপী ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ, কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অভিযোজন সক্ষমতা জোরদারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে দূষণ রোধে ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পরিবেশ দূষণ কমাতে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন দূরদর্শী উদ্যোগের অগ্রগতিও বৈঠকে বিশদভাবে জানানো হয়।

​শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রতি বর্তমান সরকারের যে দৃঢ় অঙ্গীকার রয়েছে, তা পুনর্ব্যক্ত করেন পরিবেশমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, দেশের শিল্পখাতে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সাভারের ট্যানারি শিল্পসহ অন্যান্য সমস্ত প্রধান শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা ইটিপি কার্যক্রম চালু ও তা নিয়মিত তদারকি করার বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর। আধুনিক নগর ও শিল্পায়নের বর্জ্য যেন দেশের নদ-নদী বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানান বিদেশি প্রতিনিধিরা।

​বাংলাদেশের এই সব ইতিবাচক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সীমিত সম্পদ নিয়েও যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সবুজ জ্বালানি রূপান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কার্যক্রমে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রদূত বাস্তবসম্মত কিছু সংস্কারের ওপরও জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি সহজতর করার পাশাপাশি নীতিগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং নতুন ও উদ্ভাবনী জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ রূপ নেবে।

​সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই পক্ষের নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। মন্ত্রীর সঙ্গে দেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দিকগুলো তুলে ধরেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন)। অন্যদিকে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঊর্ধ্বতন কূটনৈতিক কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন। অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই বৈঠকটি আগামী দিনের বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে যেমন আরও সুদৃঢ় করবে, তেমনি ইইউ-এর মতো বড় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বড় ধরনের সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement