হুতিদের অগ্রযাত্রায় সৌদির পাশে নেই ট্রাম্প, বাড়ছে সংকট
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনে দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। লক্ষ্য লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে নামার পথে হাঁটছেন না। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ জানিয়েছিল। ট্রাম্প সেই অনুরোধ নাকচ করেছেন। তবে ওয়াশিংটন রিয়াদকে সামরিক তথ্য দিচ্ছে এবং হুতিদের সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত ও হামলার পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার জন্য উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হামলার শিকার হয়েছে।
সোমবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কাছ থেকে নজর রাখছে’। তাঁর ভাষায়, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবে এবং ‘আমেরিকার সর্বোত্তম স্বার্থ’ যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা নিশ্চিত করবে।
মঙ্গলবার ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি হুতিদের সঙ্গে সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী চলমান যুদ্ধের বড় সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার বিষয়টি নাকচ করেন। নিউজম্যাক্সকে তিনি বলেন, হুতিরা এখনো কোনো মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়নি। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতি ‘এতটা খারাপ নয়’। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে ‘নিশ্চিতভাবেই একটি সংঘর্ষ’ চলছে, কিন্তু তা এখনো পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েনি—এটাই ভালো দিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান ২০২৫ সালের মার্চের নীতির সঙ্গে বেশ আলাদা। সে সময় লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলার জবাবে ট্রাম্প ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের একটি সিগন্যাল চ্যাট পরে ব্যাপক আলোচনায় আসে। সেই চ্যাটে ভুলবশত দ্য আটলান্টিক-এর প্রধান সম্পাদককেও যুক্ত করা হয়েছিল।
এবার ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কার্যত শেষের দিকে-ট্রাম্প প্রশাসনের এই বক্তব্য। হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান শুরু হলে সেই অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো জেফরি ফেল্টম্যান বলেন, এই মুহূর্তে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্পের ‘এই সংঘাত মূলত শেষ’-এমন বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাঁর মতে, ট্রাম্প যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং আর তেমন কিছু ঘটছে না-এমন একটি চিত্র তুলে ধরতে চাইছেন, নতুন করে আরেকটি ফ্রন্ট খুললে তা ধরে রাখা কঠিন হবে।
তবে ফেল্টম্যানের আশঙ্কা, হুতিরা যদি আরও কৌশলগত এলাকা দখল করতে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। হুতিরা এরই মধ্যে ইয়েমেনের বন্দরনগর মখা এবং লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দ্বীপ দখল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অগ্রযাত্রার প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারেও। সোমবার এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠে যায়। বুধবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২৩ ডলার।
ফেল্টম্যান প্রশ্ন তোলেন, দাম যদি গ্যালনপ্রতি ৬ ডলারে পৌঁছে যায়, তখন কী হবে। তাঁর মতে, একটা পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
বর্তমানে সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা বাব আল-মান্দেব প্রণালি। হুতিরা এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযোগকারী এই পথটি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যেই সৌদি আরবকে আরেকটি বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত সৌদির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা এই হামলা চালিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইনটি কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকতে পারে। এতে সৌদি অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক। গত এক মাসে ইরান-সমর্থিত হামলার কারণে দেশটির তেল অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা বারবার চাপে পড়ছে। সংঘাতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে তেহরান এসব হামলার মাধ্যমে চাপ তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী জাহাজও হামলার শিকার হয়। ওই ঘটনায় দুই নাবিক নিহত হন।
এর আগে আগস্টের শুরুতে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর মারিবে সৌদি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ওই হামলায় দুজন নিহত এবং এক ডজনের বেশি মানুষ আহত হন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ট্রাম্প তাতে রাজি হননি। বরং যুক্তরাষ্ট্র সামরিক তথ্য বিনিময় এবং হুতিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার জন্য উপদেষ্টা পাঠাতে সম্মত হয়েছে। অ্যাক্সিওস প্রথম এই তথ্য প্রকাশ করে।
হুতিদের ঠেকাতে সৌদি আরব যুক্তরাজ্যের কাছেও সহায়তা চাইছে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে অপারেশনাল সহায়তাও চেয়েছে রিয়াদ।
সোমবার ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং অঞ্চলের অন্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে ‘নিয়মিত যোগাযোগে’ রয়েছে। এমনকি হুতিদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করছে বলে জানান তিনি।
এদিন জেদ্দায় সৌদি যুবরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেন্টকমও বৈঠকের বিষয় হিসেবে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা’র কথা জানিয়েছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, ইরান নিয়ে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে ব্যস্ত। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির অপর পাশে নৌ অবরোধ ধরে রাখার চেষ্টাও চলছে। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা এখন খুবই সীমিত।
তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি সৌদি নেতৃত্বকে আরও একবার দেখিয়ে দিচ্ছে যে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তারা যতটা নির্ভর করতে চেয়েছিল, বাস্তবে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা হয়তো ততটা নয়।
সৌদি আরবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা মাইকেল র্যাটনি বিষয়টিকে সৌদি নেতৃত্বের জন্য ‘সত্যিই হতাশাজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়তে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
এনপিআরকে র্যাটনি বলেন, সৌদিরা ঠিক এমন একটি পরিস্থিতির জন্যই এই অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছিল-যখন তারা আক্রান্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পাবে। কিন্তু ট্রাম্প এখন পর্যন্ত ‘সাইডলাইনে’ থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, সৌদি নেতৃত্বের জন্য বিষয়টি অন্তত ‘বিরক্তিকর’, বরং ‘সত্যিই হতাশাজনক’।