সংবাদ শিরোনাম

গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে মার্কিন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড চুক্তি

 প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে মার্কিন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড চুক্তি ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর সুযোগ রেখে নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। এর মধ্য দিয়ে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের কয়েক মাসের টানাপোড়েনের একটি বড় অধ্যায়ের অবসান হলো।

ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বিশাল এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর পথ খুলে দিয়েছে চুক্তিটি। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার সময় উত্তর আটলান্টিক জোটের মিত্রদের মধ্যকার পুরোনো বিরোধও অনেকটা মিটল।

চুক্তিতে সইয়ের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং গ্রিনল্যান্ড-সবার জন্যই ‘অসাধারণ’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, গ্রিনল্যান্ডের জন্যও এটি ‘অবিশ্বাস্য’ হবে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপযুক্ত জায়গাগুলোতে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার কাজ ‘অবিলম্বে’ শুরু করবে। এর মধ্যে দুটি ‘খুব বড় সামরিক ঘাঁটি’ নির্মাণের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

কী আছে নতুন চুক্তিতে

চুক্তি অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করা যাবে। দ্বীপটির দক্ষিণাঞ্চলের নারসারসুয়াক এবং পূর্বাঞ্চলের মেস্টারসভিগে নতুন ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এর বাইরে প্রয়োজন হলে আরও প্রতিরক্ষা এলাকা প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যাবে। গ্রিনল্যান্ডের যেকোনো জায়গার ওপর দিয়ে মার্কিন সামরিক বিমান চলাচল ও অবতরণ করতে পারবে। এই অনুমতি গ্রিনল্যান্ডের আঞ্চলিক জলসীমার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাশাপাশি সমুদ্রতলের পথ ব্যবহারের সুযোগও পাবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ন্যাটোর বাইরের কোনো দেশ ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র-তিন পক্ষের সর্বসম্মত অনুমতি ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা তৈরি করতে বা সেখানে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি রাখতে পারবে না। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের বিনিয়োগকারীদের ‘সংবেদনশীল খাতে’ বিনিয়োগের ওপরও বিধিনিষেধ থাকছে।

চুক্তিটির কোনো নির্ধারিত মেয়াদ নেই। ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও সেটি ন্যাটোর সদস্য থাকবে এবং এই চুক্তির আওতায় ডেনমার্কের দায়িত্বগুলো গ্রহণ করবে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রোজালিন্ড জর্ডান বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকারের হাতেই থাকবে। তবে দ্বীপটিতে অন্য কোনো দেশের উপস্থিতির বিষয়ে কার্যত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা পাবে যুক্তরাষ্ট্র।

তাঁর ভাষ্য, এই চুক্তিতে ওয়াশিংটন তার চাওয়া অনেকটাই পেয়েছে-গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ এবং বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে সেখানে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা।

ট্রাম্পের হুমকির পর মাসের অচলাবস্থা

গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কয়েক মাস ধরে তীব্র টানাপোড়েন চলছিল। মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করলে ন্যাটো জোটই ভেঙে পড়তে পারে।

নতুন চুক্তির আগে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে অনেকটাই কমে এসেছিল। ১৯৪৫ সালে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি ঘাঁটিতে কয়েক হাজার সেনা ছিল। এখন প্রত্যন্ত পিটুফিক ঘাঁটিতে প্রায় ২০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন।

চুক্তিটিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন ‘চিরস্থায়ী হতে পারে এমন একটি চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন এটিকে ‘সবার জন্য জয়’ বলে মন্তব্য করেন।

নিলসেন বলেন, ‘আপনাদের নিরাপত্তাই আমাদের নিরাপত্তা, আর আমাদের নিরাপত্তাই আপনাদের নিরাপত্তা।’

চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ন্যাটোও। জোটটির মহাসচিব মার্ক রুটে এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা আলাদাভাবে সমঝোতার প্রশংসা করেছেন।

কোস্তা এটিকে আন্তঃআটলান্টিক সহযোগিতা ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই উদ্যোগের ভিত্তি হচ্ছে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সম্মান।

সূত্র: আলজাজিরা